রাজধানীর উত্তরা থেকে মিরপুর হয়ে মতিঝিল দৈনন্দিন যাতায়াতে স্বস্তি এনে দিয়েছে মেট্রোরেল, তবে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে আরেকটি নতুন পরিবেশগত উদ্বেগ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার মেট্রোরেল করিডোর এবং এর দুইপাশে প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় তাপমাত্রা বেড়েছে ৩-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। গবেষকেরা একে বলছেন ‘স্থানিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি’ বা ‘হিট করিডোর’।
গবেষণাটি যৌথভাবে করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্র ও তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা দেখেছেন, করিডোর জুড়ে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ২০১৫ সালে যেখানে ছিল ২৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৩ ডিগ্রিতে।
যে এলিভেটেড রুটগুলোর মধ্যে খুবই ইম্পর্টেন্ট একটা রুট হচ্ছে এমআরটি লাইন সিক্স। গবেষকরা জানান, তারা ল্যান্ডসেট স্যাটেলাইটের থার্মাল ব্যান্ড ব্যবহার করে স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যানালাইসিস করেছেন। ২০১৫-১৬ সালের দিকে যেখানে এই রিজিয়নের গ্রীষ্মের দিনের গড় ল্যান্ড সারফেস টেম্পারেচার ছিল ২৭ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেটা ছিল নির্মাণকালীন সময়। তার পরবর্তীতে গড় তাপমাত্রা বেড়ে ৩০, ৩২, ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। অর্থাৎ যে মেটেরিয়াল দিয়ে এই রুট তৈরি, সেটা অতিরিক্ত তাপ শোষণ করছে।
গবেষকদের মতে, মেট্রোরেল নির্মাণের সময় গাছপালা অপসারণ, কংক্রিটের স্থাপনার তাপশোষণ ক্ষমতা এবং উড়ালপথ ও স্টেশনের কারণে বাতাস চলাচলে বাধা-এই তিনটি কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে।
প্রত্যেকটা স্ট্রাকচার তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অবদান রাখলেও এলিভেটেড ওয়েগুলো অন্যগুলোর চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। কেননা এসব স্ট্রাকচার সূর্যের প্রতি বেশি এক্সপোজড, বেশি সোলার রেডিয়েশন গ্রহণ করে এবং বেশি তাপ শোষণের সুযোগ পায়।
একই সময়ে এখানে দুইটি লেয়ার তৈরি হয়। একটি লেয়ার নিচে থাকে, যা আমাদের ঐতিহ্যবাহী পিচঢালাই রাস্তা। এখন এর ওপরে আরেকটি লেয়ার যুক্ত হয়েছে। আগে যেখানে একটি লেয়ার তাপ শোষণ করত, এখন দুইটি লেয়ার তাপ শোষণ করে। উপরের লেয়ারটি নিচের লেয়ার থেকে নির্গত তাপকে আটকে দেয়, ফলে এলাকাটি একটি বদ্ধ করিডোরের মতো কাজ করে। যে হারে তাপ শোষিত হয়, সেই হারে তা নির্গত হওয়ার সুযোগ পায় না, যা তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি শেখ মোহাম্মদ মেহেদী হাসান মনে করেন, নগরজীবনে মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামোর বিকল্প নেই। পৃথিবীর অন্য দেশেও মেট্রোরেলের প্রভাবে আশপাশের তাপমাত্রা বেড়েছে, তবে সঠিক পরিকল্পনা ও সবুজায়নের মাধ্যমে তারা নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা বজায় রেখেছে।
তিনি বলেন, যেখানে যেখানে মেট্রোরেল হয়েছে, সেই শহরেই ওই লাইন ধরে কিছু না কিছু তাপমাত্রা বেড়েছে। যেমন সিঙ্গাপুরে তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৫ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। ওদের কিন্তু তিন থেকে পাঁচ ডিগ্রি বাড়েনি। জাপানে বেড়েছে ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রি পর্যন্ত। অন্যান্য দেশের তাপমাত্রা যদি ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রির মধ্যে রাখতে পারে, তাহলে আমাদের কেন তিন থেকে পাঁচ ডিগ্রিতে চলে যাবে?’
মেহেদী হাসানের মতে, আমাদের পরিকল্পনায় ভুল ছিল। যেসব প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো উন্নয়ন করে, তারা প্রকল্প ডিজাইনের সময় পরিবেশগত দিক এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও ইকোলজিক্যাল সিস্টেমকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দেয়।
এমন অবস্থায় তিনি মেট্রোরেলের পিলারের পাশে লতাজাতীয় গাছ লাগানো, স্টেশন ও আশপাশের ভবনের ছাদে ছাদবাগান তৈরি এবং খোলা সবুজ জায়গা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। যেখানে যতটুকু সুযোগ আছে, গ্রিন করে ফেলা। মেট্রোলাইনের নিচে দিয়ে হোক, রাস্তার মাঝখানের মিডিয়ানে হোক, স্টেশনের ছাদে হোক-এখানে যে ধরনের গাছ হয় সেগুলো লাগিয়ে আমাদের পুরো লাইনটাকে সবুজ করে ফেলা উচিত। তাহলে তাপমাত্রা মিনিমাইজ হবে।