আফগান-পাক সীমান্তে নতুন করে রণদামামা

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে নতুন করে সীমান্ত সংঘাত শুরু হয়েছে। দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে আন্তঃসীমান্ত হামলার অভিযোগ এনেছে, যার ফলে গত মার্চে স্বাক্ষরিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

আফগানিস্তানের তালিবান কর্তৃপক্ষ সোমবার (২৭ এপ্রিল) জানিয়েছে, দেশটির পূর্বদিকের কুনার প্রদেশে পাকিস্তানি হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের দাবি, দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে আফগান সীমান্ত থেকে চালানো গুলিবর্ষণে অন্তত তিনজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।

তালিবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী মর্টার ও রকেট হামলা চালিয়েছে, যাতে অন্তত ৪৫ জন আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, কুনার প্রদেশের রাজধানী আসাদাবাদের সৈয়দ জামালুদ্দিন আফগানি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আবাসিক এলাকা লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, নারী ও শিশু রয়েছে।

এই ঘটনাকে 'ক্ষমার অযোগ্য যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে বর্ণনা করে ফিতরাত বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাই, যেখানে সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।’

তবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে 'ডাহা মিথ্যা' বলে উড়িয়ে দিয়েছে। দেশটির দাবি, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালানো হয়নি। এদিকে, পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর এক মুখপাত্র দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের ঘটনাকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে সবচেয়ে গুরুতর সংঘর্ষ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

চীনের মধ্যস্থতায় গত মাসে দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। ২০২১ সালে তালিবান দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। তুরস্ক, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবও এই বিরোধ মেটাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রধান বিরোধ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তান যেন তাদের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে দমন করে। পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তানের ঘাঁটি ব্যবহার করে টিটিপি পাকিস্তানে প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে। তবে কাবুল এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেছে যে, পাকিস্তান নিজেই শত্রুভাবাপন্ন গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেয় এবং আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে না।

গত বছরের অক্টোবর থেকে সীমান্তে ব্যাপক সহিংসতার কারণে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় বন্ধ রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইন বরাবর আফগান বাহিনীর অভিযানের পর গত কয়েক বছরের মধ্যে ভয়াবহতম লড়াই শুরু হয়। সে সময় পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা চালিয়ে ঘোষণা করেছিল যে, দুই দেশ 'খোলাখুলি যুদ্ধে' লিপ্ত।

পরবর্তীকালে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মার্চ মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। চীন তখন জানিয়েছিল, উভয় পক্ষ উত্তেজনা না বাড়াতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এই সহিংসতা সেই শান্তি প্রক্রিয়াকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল।

আফগান সংবাদমাধ্যম টোলো নিউজের তথ্যমতে, গত রবিবার স্পিন বোলডাক সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে এক শিশু নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নতুন উত্তেজনার সূত্রপাত। ওই ঘটনার পর থেকেই তালিবান বাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়।

সূত্র: আল-জাজিরা