সুবিধা দিতে চাইলেও বাস্তবতা কঠিন

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে। এ অবস্থায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে ব্যবসা সহজ করতে যেসব আনুষঙ্গিক বাধা রয়েছে, তা খাতসংশ্লিষ্টদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের ভিত্তিতে আগামী তিন মাসের মধ্যে সমাধান করা আশ^াস দিয়েছেন তিনি। আর অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে তিন বছর সময় লাগবে বলে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন।

গতকাল বুধবার রাজধানীর এক হোটেলে আগামী বাজেট নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এফবিসিসিআইয়ের যৌথ পরামর্শক সভা হয়। এতে বক্তব্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খানসহ বিভিন্ন শিল্প খাতের নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা খাতসংশ্লিষ্ট সমস্যা ও করণীয় প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। বিশেষ করে এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে রাজস্ব, শুল্ক ও ভ্যাটসংক্রান্ত প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হয়। সভায় মন্ত্রীদের সংক্ষিপ্ত সময় উপস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী কারণ ব্যাখ্যা করেন।

অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের শুল্ক-কর প্রস্তাব সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শুল্ক-কর নিয়ে যতটা পারি করব। হয়তো পুরোটা পারব না, তবে ব্যবসা সহজ করতে আইনকানুন, নিয়মনীতি ব্যবসা সহায়ক করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিদ্যমান বাধাগুলো চিহ্নিত করে জানালে আগামী তিন মাসের মধ্যে সেগুলোর সমাধান করা হবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আগামী বাজেটে করের ক্ষেত্রে ব্যাপক ছাড় দেওয়ার সুযোগ সীমিত। এই কঠিন সময়ে করের ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ব্যবসা সহজ করতে যেসব আনুষঙ্গিক বাধা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত দূর করা হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার কর আদায় বাড়াতে চায়, কারণ রাজস্ব না বাড়লে ব্যবসায়ীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার দেশজুড়ে ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড ওয়ান ওয়ালেট চালুর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সব লেনদেন নজরদারির আওতায় আসবে, ফলে কর ফাঁকি কমবে এবং দুর্নীতি হ্রাস পাবে। প্রকল্পটি এরই মধ্যে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব ধরনের বাধা ধীরে ধীরে দূর করা হবে। প্রাইভেট সেক্টরের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা হবে। সরকার ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো বুঝতে পারছে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করছে। আমরা মাত্র দুই মাস হলো দায়িত্ব নিয়েছি। এই অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। প্রাইভেট সেক্টরই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তাই তাদের সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিচ্ছি। বর্তমানে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত ভালো করছে, তবে অন্যান্য খাত কেন পিছিয়ে রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে।

বাংলাদেশ অ্যালুমিনিয়াম ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওবায়দুর রহমান আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘আমাদের ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আমাদের এসব ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচান।’

অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাবও করা হয়। নন-লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রে করহার সাড়ে ২৭ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ ছাড়া টার্নওভার কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার কথাও বলেছে এফবিসিসআই। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতসহ সব শিল্প খাতের ওপর যে ১ শতাংশ হারে উৎসে কর বসে, তা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার কথা প্রস্তাব করেছে এফবিসিসিআই। এই করহার পাঁচ বছর অব্যাহত রাখার দাবি জানানো হয়। দেশের সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের স্বার্থে স্থানীয় পর্যায়ে সব পণ্যের সরবরাহের ক্ষেত্রে ভ্যাট হার ২ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে এফবিসিসিআই।

এ ছাড়া দেশে উৎপাদিত হয় না, এমন শিল্পের যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, শিল্পের কাঁচামাল ও উপকরণের আমদানিতে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং দেশে উৎপাদিত হয় এমন ধরনের যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ এবং শিল্পের কাঁচামাল ও উপকরণের আমদানিতে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছে এফবিসিসিআই। এতে দেশি শিল্প সুরক্ষা পাবে বলে মনে করছে এফবিসিসিআই।