'হামজার সঙ্গে খেলতে না পারার আক্ষেপ থাকবে', বিদায় বেলায় মামুনুল

সময়ের সতীর্থরা অনেক আগেই ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন। তবে মামুনুল ইসলাম সেই পথে হাটেননি। ক্যারিয়ারের ক্রান্তিলগ্নে ফর্টিস ফুটবল ক্লাবের আঙিনায় ঠাঁই হয়েছিল তার। সেখানেই চারটি মৌসুম কাটানোর সুযোগ বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারটাকে দীর্ঘ করতে পেরেছেন। তবে একটা সময় তো বিদায় বলতেই হবে। সেই বলার সময়টা হয়েছে। আজই শেষবারের মতো খেলতে নামবেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। ফর্টিসের হয়ে বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় খেলবেন ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। প্রতিপক্ষ রহমতগঞ্জ। দুই যুগের পথচলার প্রান্তে পৌঁছে একটু আবেগ তাড়িত হয়ে পড়লেন মামুনুল। বৃহস্পতিবার ফর্টিস ক্লাবের আয়োজনে হওয়া সংবাদ সম্মেলনে অশ্রুসজল মামুনুল ফিরে তাকালের ফেলা আসা অতীতে। যেখানে রেখে এসেছেন অম্ল-মধুর সব স্মৃতি।

সাভার বিকেএসপিতে ভর্তি হয়েছিলেন পঞ্চম শ্রেণীতে। ফুটবলে নয়, জিমন্যাস্টিকসে। তিন বছর শারীরিক কসরতেই মনযোগ ছিল। সুযোগ পেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতেন ফুটবল। বাঁ পায়ে তার বল নিয়ে কারিকুরিতে মুগ্ধ হতো সতীর্থরা। স্যাররাও উৎসাহ দিয়ে বলতেন- "একটিবার ফুটবলে চেষ্টা করে দেখো।" সে সময় বিকেএসপি'তে চাইলেই ডিসিপ্লিন পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না। তারপরও অ্যাথলেট মামার চেষ্টায় সুযোগ পান ফুটবলে ট্রায়াল দেওয়ার। অস্টম শ্রেনীতে ট্রায়ালের কঠিণ পথ পেরিয়ে সুযোগটাও পেয়ে যান। ফুটবল প্রতিভা বিচ্চুরণটা শুরু থেকেই। পরের বছরই ডাক পান বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ দলে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি মামুনুলকে। ২০০৪ সালে অনূর্ধ্ব-২০ দল এবং ২০০৬ সালে সুযোগ পান অনূর্ধ্ব-২৩ দলে। আর ২০০৭ সালে হয় সিনিয়র জাতীয় দলে অভিষেক। এরপর টানা ২০২১ সাল পর্যন্ত লাল-সবুজের প্রতিনিধি হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন মধ্যমাঠের আস্থা। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতীয় দলকে। 

জাতীয় দলে অভিষেকের দুই বছর আগেই অবশ্য শীর্ষ ফুটবলে নাম লেখান। ২০০৫ সালে প্রিমিয়ার লিগ জয়ী ব্রাদার্সে মামুনুল সুযোগ পান। সেখানে পরের মৌসুমেও ব্রাদার্সে কাটানোর পর ২০০৮ সালে সুযোগ হয় আবাহনীতে। পরের মৌসুমে মোহামেডান। এরপর একে একে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, চট্টগ্রাম আবাহনী এবং সর্বশেষ ফর্টিসে যোগ দেন ২০২২ সালে। বিদায়ক্ষণে তাকে ঘিড়ে শুভানুধ্যায়ীদের নতুন এক শুরুর প্রত্যাশা। খেলা ছাড়লেও যাতে ফুটবল না ছাড়েন, নিজের অভিজ্ঞতা, খ্যাতী কাজে লাগিয়ে যাতে নতুন নতুন মামুনুল তৈরী করেন সেই প্রত্যাশা জানিয়েছেন ফর্টিস গ্রুপের কর্নধার শাহাদাত হোসেন। ফর্টিস ক্লাবের সভাপতি শাহীন হাসানেরও চাওয়া ফর্টিসের সঙ্গেই যেন থাকেন মামুনুল, হয়তো অন্য কোন পরিচয়ে। 

মামুনুল কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে শুরুতেই বলেছেন তিন মাস আগে হারানো বাবার কথা। বাবাকে মনে করতে গিয়ে কান্না বেঁধে রাখতে পারেননি। এরপর নিজেকে গুঁছিয়ে নিয়ে কৃতজ্ঞতার বাধনে বেধেছেন সমর্থক, ক্লাব, কর্মকর্তা, দীর্ঘদিনের সতীর্থ ও তারকায় রূপ দেওয়ার নেপথ্যে থাকা সংবাদকর্মীদের। বিশেষভাবে বলেছেন ফর্টিস এফসি'র কথা, 'দুঃসময়ে ফর্টিস আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে টানা চার বছর কোন ক্লাবে খেলিনি। ফর্টিসে সময়টা কাটিয়েছি, পেয়েছি অনেক সম্মান। তাদের প্রতি তাই কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।' 

ফুটবলেই খ্যাতী, যশ, অর্থ, সম্মান সব মিলেছে। আবার ফুটবল থেকেই জুটেছে বেশ কিছু আক্ষেপ-অপ্রাপ্তি। বাংলাদেশের হয়ে একটিবারও সাফ জিততে না পারা ক্যারিয়ারে বড় আক্ষেপ মামুনুলের, 'সাফ জিততে পারিনি, এই আক্ষেপটা আজীবন তাড়া করে বেড়াবে। এছাড়া প্রথম ও একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে আইএসএল-এর অ্যাথলেটিকো ডি কোলকাতায় নাম লিখিয়ে গেম টাইম না পাওয়াটা বড় অপ্রাপ্তি হয়ে থাকবে। আবার বলতে পারেন, হামজার মতো ফুটবলারের সঙ্গে খেলতে না পারাও একটা আক্ষেপ হয়ে থাকবে। হামজার মতো একজন পেছনে থাকলে মাঠে খেলার আত্মবিশ্বাসই তো বেড়ে যেতো অনেক। তখন গোল করা ও করানোর কাজটা আরও সহজ হতো।' অভিমানও আছে কিছু, 'বিদায় বেলায় কারো প্রতি কোন রাগ-ক্ষোভ রাখতে চাই না। তবে আমার মনে হয়েছে ফুটবলাররা যদি দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সময় আরেকটু যত্ন পেতো, বিশেষ করে চোট পেলে সুচিকিৎসা পেতো, তাহলে হয়তো কোন কষ্ট থাকতো না।'

ভবিষ্যত নিয়ে বলতে গিয়ে ফুটবলকেই আকড়ে ধরে রাখার কথা বলেছেন মামুনুল। তবে এ জন্য চেয়েছেন ফুটবলপ্রেমীদের সহযোগিতা, 'আমাদের দেশে বড় সমস্যা ভালো মাঠ ও আর্থিক সঙ্কট। এই দুটি সঙ্কট দূর করতে যদি কারো সহযোগিতা পাই, তবে কথা দিচ্ছি, আমার হাত দিয়ে সত্যিকারের প্রতিভাবান ফুটবল বের হয়ে আসবে।যারা অন্তত আমার মতো সাফ জিততে না পারার আক্ষেপে পুড়বে না।'
হামজার প্রসঙ্গে টেনে শেষটায় মামুনুল নিজের বিশ্বাসের কথাটা বলেছেন এভাবে, 'আমি মনে করি, হামজা, শামিতরা আসার পর আমাদের শক্তি অনেক বেড়েছে। আমাদের এখনই সময় এসেছে সাফ শিরোপা জয়ের।'