বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমেছে বেড়েছে পরিশোধের চাপ

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় উভয়ই কমেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় ফেরার পরও উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি। অন্যদিকে, আগের তুলনায় বেড়েছে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীলতায় অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) জুলাই থেকে মার্চ সময়ের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে মোট বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে ২৮০ কোটি ৪১ লাখ ২০ হাজার ডলার। এর মধ্যে ঋণের অংশ ২৬৫ কোটি ৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার এবং অনুদান ১৫ কোটি ৩৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এই পরিমাণ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ কোটি ডলার কম, যা উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়ার ইঙ্গিত দেয়। ইআরডির হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাই-মার্চ সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় কমেছে ১৯ শতাংশ এবং ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে ৬.৬৯ শতাংশ। বিপরীতে, ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ৯.৭৪ শতাংশ।

প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অর্থছাড়েও এসেছে বড় ধরনের পতন। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে মোট অর্থছাড় হয়েছে ৩৮৯ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪৮০ কোটি ৮৮ লাখ ২০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৯০ কোটি ডলারের মতো কম অর্থছাড় হয়েছে। অর্থছাড়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে ঋণ হিসেবে এসেছে ৩৫০ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং অনুদান ৩৮ কোটি ৫১ লাখ ডলার। অন্যদিকে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ হিসেবে এসেছিল ৪৪৭ কোটি ৫৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার এবং অনুদান ছিল ৩৩ কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এতে বোঝা যায়, অনুদানের পরিমাণ সামান্য বাড়লেও মূল ঘাটতি তৈরি হয়েছে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ায়।

ঋণ ছাড়ে এগিয়ে রাশিয়া, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি। ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে রাশিয়া প্রায় ৮৩ কোটি ডলার। এর পরেই রয়েছে বিশ্বব্যাংক, যারা দিয়েছে প্রায় ৭৬ কোটি ডলার। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে প্রায় ৬১ কোটি ডলার। এ ছাড়া চীন দিয়েছে ৫২ কোটি ডলার, জাপান ৩১ কোটি ডলার এবং ভারত দিয়েছে প্রায় ২৪ কোটি ডলার।

ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ। ঋণপ্রাপ্তি কমলেও পুরনো দায় পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সুদ ও আসল মিলিয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩২১ কোটি ২০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। অর্থাৎ মোট পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৩০ কোটি ডলারের বেশি।

এর মধ্যে সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১২৪ কোটি ৮৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ১২০ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ডলার থেকে প্রায় চার কোটি ডলার বেশি। একইভাবে আসল পরিশোধও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ২২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২০১ কোটি ১০ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ আসল পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ১৬ কোটি ডলার।

ঋণ প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমে যাওয়ার বিপরীতে সুদ ও আসল পরিশোধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ তৈরি করছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, কারণ নতুন অর্থপ্রবাহ কমে গেলে চলমান প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থছাড় কম হওয়ার কারণ হিসেবে ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কম থাকায় চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের ছাড় এমনিতেই কম হয়েছে। অন্যদিকে, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাক্সিক্ষত গতি আসেনি। আবার চলমান অনেক প্রকল্প নতুন করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মূলত এসব কারণেই বৈদেশিক অর্থছাড় কমেছে। ঋণ পরিশোধের বিষয়ে তারা বলেন, বিগত সময়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যেসব ঋণ নিয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোর ‘গ্রেস পিরিয়ড’ শেষ হয়ে যাওয়ায় পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে।