নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে নজর বাড়ানোর আহ্বান

দমধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ মানবিক বিপর্যয়ই ঘটায়নি, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে জীবাশ্ম জ্বালানির দাম বাড়িয়ে পরিবার, ব্যবসা ও সরকারের বাজেটকে কঠিন চাপে ফেলেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রচ- চাপে ফেলেছে। ফলে বিশ্বে অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে। গত বুধবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও জ¦ালানিসংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল এ কথা বলেন। তিনি নবায়নযোগ্য শক্তির (সৌর ও বায়ু) দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানান।

সাইমন স্টিল বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ওই অঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি থমকে যাচ্ছে এবং এ সংঘাতের নির্মম সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। যারা পৃথিবীকে জীবাশ্ম জ্বালানির (তেল, গ্যাস ও কয়লা) ওপর নির্ভরশীল রাখতে লড়াই করেছে, তারাই অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি ঠেকাতে বিদ্যুৎ গ্রিডের উন্নয়ন, শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থা, মিথেনের নির্গমন কমানো এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। জলবায়ুজনিত ও সংঘাতজনিত কারণে খাদ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমাদের এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে; নষ্ট করার মতো সময় নেই।’

বৈঠকে জানানো হয়, গত বছর পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় দ্বিগুণ হওয়ার পথে ছিল। ২০২৪ সালের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ৬০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বেড়েছে, যা বড় অগ্রগতি; যদিও নবায়নযোগ্য জ¦ালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া এখনো অসম। জীবাশ্ম জ্বালানির চলমান ব্যয়-সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থনৈতিক যুক্তিকে উপেক্ষা করার সুযোগ রাখছে না।

বৈঠকে জানানো হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিরাপদ, সস্তা ও পরিচ্ছন্ন শক্তির জোগান দেয়, যা বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে জিম্মি হতে পারে না।

স্পেন ও পাকিস্তানের মতো নবায়নযোগ্য সম্পদ সমৃদ্ধ দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যয়-সংকটের সবচেয়ে খারাপ প্রভাবের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছে। এ কারণেই অনেক দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনাকে দ্রুততর করছে। তারা জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতি, প্রতিযোগ-সক্ষমতা, নীতির স্বাধীনতা ও মৌলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এটি করছে।

বৈঠকে জানানো হয়, ফ্রান্সে বিদ্যুতায়নে অর্থায়ন দ্বিগুণ হচ্ছে। চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ আরও অনেক দেশ স্পষ্ট করেছে যে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ঘটানো জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যই জরুরি। রূপান্তরের গতিকে কাজে লাগিয়ে সত্যিকারের বৈশ্বিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে। বর্তমান সংকটের মোকাবিলায় সরকারগুলো যেন দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নতুন করে নির্ভরশীল না হয়ে ওঠে।

অনেক উন্নয়নশীল দেশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে ভর করতে চায় ও জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন করতে চায়। কিন্তু অর্থায়নের অভাব ও ঋণসংকটের মতো বাধা তাদের আটকে রেখেছে। বর্তমান সংকটের মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানিতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে হবে এবং বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাব কমাতে হবে।

এ ছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু-অর্থায়ন দ্রুত বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। জলবায়ু-তহবিলের নতুন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের রোডম্যাপ কার্যকর করতে হবে।

বৈঠকে জানানো হয়, বিদ্যুৎ গ্রিড ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগ দরকার, যাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের পরের ধাপে পৌঁছানো যায়। শক্তিশালী গ্রিন হাউজ গ্যাস মিথেনের নির্গমন দ্রুত কমাতে হবে, এতে দ্রুত জলবায়ুগত সুফল পাওয়া যাবে, অর্থেরও সাশ্রয় হবে।

বৈঠকে জানানো হয়, খাদ্যনিরাপত্তার দিকেও তীক্ষè নজর রাখতে হবে। জলবায়ুজনিত ধাক্কা থেকে ফসল-উৎপাদনকে রক্ষা করতে হবে। যুদ্ধের কারণে সার-সংকট তৈরি হচ্ছে। এ বছর চার কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।