ঘুষকান্ডের কারণে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ৯টি মাল্টিস্টোরেজ বিল্ডিং নির্মাণকাজ আটকা পড়েছে। কবে নাগাদ ভবনের কাজ শুরু হবে, তা বলতে পারছে না কেউ। এতে বিপাকে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। একদিকে তাদের মালামাল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংকঋণের সুদ বাড়ছে। নানা চেষ্টা-তদবির করেও কোনো সুরাহা করতে পারেননি তারা। ফলে সার্বিক বিষয়ে ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সবশেষ তারা আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।
জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেট পাস হওয়া এসব ভবন নির্মাণে বাজেট ধরা হয়েছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এদিকে কাজ শুরু করতে অভ্যন্তরীণ মতামত দিয়ে বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। তবে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঠিকাদাররা অভিযোগ করে বলেন, বেবিচক থেকে কার্যাদেশ পাওয়ার পর তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। তাতে রাজি না হওয়ায় কাজগুলো তৎকালীন চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল কবির ভূঁইয়াকে দিয়ে বন্ধ করে দেন। এতে ঠিকাদাররা পড়েছেন মহাসমস্যায়। বেবিচক কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগাদা দিলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তারা আরও বলেন, অথচ কাজগুলো পাওয়ার পর আমরা ব্যাংক লোন নিয়ে নির্মাণসামগ্রী ক্রয় করেছি। বর্তমানে ওই সব মালামাল প্রায় ২ বছর ধরে পড়ে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদ গুনতে হচ্ছে। সাবেক ওই প্রকৌশলী দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারান্তরীণ আছেন।
বেবিচক সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯টি উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডার আহ্বানের পর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। যেসব ভবনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল সেগুলো হলো ২১ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় কুর্মিটোলায় ১৪তলা আবাসিক ভবনসহ অন্যান্য কাজের জন্য ভবন নির্মাণ, কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ২৪ মে। একই ধরনের কাওলায় ২১ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় আরেকটি ভবন নির্মাণ ২০২৪ সালের ১০ জুলাই অনুমোদন হয়। সিভিল এভিয়েশন একাডেমিতে মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, অনুমোদন হয়েছিল ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর। ২৩ কোটি ৪৬ লাকা টাকা ব্যয়ে তৃতীয় টার্মিনালের দক্ষিণ পাশে সিভিল এভিয়েশনের স্ট্যাকহোল্ডাদের জন্য ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি।
এ ছাড়া বেবিচক সদর দপ্তরের পূর্ব পাশে ভবন-৬ নির্মাণ আন্ডারগ্রাউন্ডসহ অন্যান্য সব সুবিধার ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ২০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর। সেমসু অফিস কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণে ২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর। তেজগাঁওয়ে আবাসিক ভবন নির্মাণে ২০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট। একই এলাকায় ২২ কোটি ৩৫ লাখ ব্যয়ে আরেকটি ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট। ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে কুর্মিটোলা আমবাগানে মসজিদ নির্মাণসহ অন্যান্য কাজের ভবন নির্মাণে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ৩ জুলাই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেবিচকে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান চেয়ারম্যানকে দিয়ে কাজ বন্ধের পরও ঠিকাদাররা নানাভাবে কাজ শুরুর চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু কোনোভাবেই তারা শুরু করতে পারেননি। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দেন। এরপর বেবিচকের প্রকৌশলী দপ্তর পুরো বিষয় পর্যালোচনা করে। তারা ওই বছরের আগস্টে চেয়ারম্যানের কাছে মতামত দেয়। সেখানে বলা হয় ‘ভবন নির্মাণের প্রকল্পটি যথাযথ নিয়ম মেনে সম্পন্ন হয়েছে। কার্যাদেশ দেওয়ার পরও ঠিকাদাররা কাজ শুরু করতে না পারায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এমতাবস্থায় তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন। এ প্রকল্পে কোনো প্রকার অসততার তথ্য পাওয়া যায়নি। এখন ঠিকাদাররা আইনের আশ্রয় নিলে বেবিচকের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ঠিকাদারদের কাজ করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।’ মতামতে বেবিচকের তিন প্রকৌশলী স্বাক্ষর করেন। এর এক বছর পার হলেও আগের মতোই কাজ বন্ধ রয়েছে। এমতাবস্থায় ঠিকাদাররা আইনের আশ্রয়ে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আমরা এত ধরণা দিয়েছি, তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। বরং আশ্বাসে মাস, বছর কেটে যাচ্ছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এই কারণে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ ছাড়া আমাদের কোনো পথও নেই। তারা আরও জানান, আমার কাজের জন্য ব্যাংকঋণ নিয়ে মালামাল ক্রয় করেছি। এখন একদিকে মালামাল নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকঋণের সুদ বাড়ছে। তাই আমরা আইনগত ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি। আমাদের তাগাদার কারণে প্রকৌশল বিভাগ কাজ শুরু ও মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে মতামত দিলেও সেটিও প্রায় এক বছরে কার্যকর হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা ভাবছি। দ্রুত বিষয়টি সমাধান করা হবে।