ফের যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা ইরানের

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত বন্ধে শান্তি আলোচনা নিয়ে অচলাবস্থার সমাধান হয়নি। দুই দেশই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। যুদ্ধের অবসানে কয়েকদিন আগে ইরান একটি তিন ধাপের শান্তি প্রস্তাব দিলেও, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা নাকচ করে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইরান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে নতুন আরেকটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে তেহরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবেও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরান আদৌ কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। হোয়াইট হাউজের সাউথ লনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) একটি চুক্তি করতে চায়। কিন্তু আমি এতে সন্তুষ্ট নই’। ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবের ঠিক কোন বিষয়টি তিনি গ্রহণ করতে পারছেন না, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি ট্রাম্প। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরানের কর্মকর্তারা হয়তো কখনোই আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী মীমাংসায় পৌঁছাতে পারবেন না। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে তারা শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই’। এ সময় তিনি ইরানের নেতাদের মধ্যে ‘প্রচণ্ড মতভেদ’ রয়েছে বলেও দাবি করেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে আবার যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে বলে জানিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। ইরানের সামরিক সদর দপ্তরের ডেপুটি মোহাম্মদ জাফর আসাদি ফারস নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তিতেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়; তাই এই সংঘাত আবার শুরু হওয়া ‘সম্ভব’। আসাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য মূলত মিডিয়া-কেন্দ্রিক। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো, প্রথমত তেলের দাম কমে যাওয়া ঠেকানো এবং দ্বিতীয়ত নিজেদের তৈরি সংকট থেকে বেরিয়ে আসা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে অনাস্থা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, অতীত ইতিহাস এবং প্রমাণ বলছে যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তি বা সনদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়। যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার ঘোষণা দিয়ে আসাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে দুঃসাহস বা বোকামির জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে, তাহলে তেহরান কূটনৈতিক আলোচনার জন্য প্রস্তুত।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ‘জলদস্যুদের মতো’ কাজ করেছে। ইরানের বন্দরগুলোতে পাল্টা অবরোধ চলাকালে একটি জাহাজ জব্দ করতে চালানো সামরিক অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। শুক্রবার ফ্লোরিডার এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, আমরা জাহাজের ওপর চড়াও হলাম এবং সেটি দখল করলাম। আমরা কার্গো এবং তেল দখল করলাম। এটি খুব লাভজনক ব্যবসা। এ সময় সমবেত জনতার করতালির মধ্যে তিনি আরও বলেন, আমরা জলদস্যুদের মতো কাজ করছি। এই অবরোধ কার্যকরের বিষয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে দায়িত্ব পালনরত ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত অবরোধ নিশ্চিত করতে তারা ৪৫টি জাহাজকে ভিন্ন পথে পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর তৎপরতাকে ট্রাম্প যখন জলদস্যুবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করছেন, ঠিক তখনই হরমুজ প্রণালিতে নিজের নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির এক প্রতিবেদনে জানা গেছে এ তথ্য। আইআরজিসির নৌবাহিনী কমান্ডের বিবৃতির বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব উপসাগর এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ইরানি উপকূল অংশের ২ হাজার কিলোমিটার উপকূলরেখার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইআরজিসির নৌবাহিনী। শিগগিরই এ ইস্যুতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান ইরানের নৌশক্তিকে পুরোপুরি পরাজিত করার দাবি করা হলেও, এখনো হরমুজ প্রণালিতে তাদের কিছু ‘ফাস্ট অ্যাটাক বোট’ বা দ্রুতগামী যুদ্ধযান সক্রিয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটি’র এক শুনানিতে তিনি আরও বলেন, ইরানের নৌবাহিনী বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হলেও তাদের ছোট ও দ্রুতগতিসম্পন্ন কিছু যুদ্ধযান রয়ে গেছে। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের ১৫৯টি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে, যা ছিল দেশটির নৌবাহিনীর সার্বিক সক্ষমতা। ড্যান কেইন স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানের কাছে থাকা কার্যকর যুদ্ধযানগুলো ওই অঞ্চলে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে সক্ষম; বিশেষ করে তাদের দ্রুতগামী নৌযানগুলো এখনো বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।