হয়রানি হবে না নিশ্চয়তা পেলে দেশে ফিরতে চান সাকিব

‘ইইউ টি-টোয়েন্টি বেলজিয়াম’র লঞ্চিং ইভেন্ট ছিল সম্প্রতি মুম্বাইয়ে। সেই আয়োজনে ছিলেন এই টুর্নামেন্টে রয়্যাল ব্রাসেলস দলের অধিনায়ক বাংলাদেশের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। বর্তমানে দেশের বাইরে এই ধরনের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতেই খেলছেন তিনি। পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে ফিরতে পারেননি ওই সরকারের এই সংসদ সদস্য। তার দেশে ফেরা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা হয়েছে, অনেকবারই অনেক সম্ভাবনার কথা শোনা গেছে। বাস্তবে হয়নি কিছুই।

মুম্বাই থেকে ফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সাকিব। বলেছেন, তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা ও বাধার নানা দিক নিয়ে।

দেশে ফেরার আশা পুরোপুরি আছে বলেই জানালেন তিনি এবং ফিরতে চান তাড়াতাড়িই। তবে দেশে ফেরার পথে মূল বাধা মনে করেন তিনি নিরাপত্তার শঙ্কাকে। সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত হয়রানির শিকার না হওয়ার নিশ্চয়তা পেলেই দেশে ফিরবেন বলে জানালেন দেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ১৭ দিন পর সাকিবের নামে হত্যা মামলা হয় রাজধানীর আদাবর থানায়। পোশাককর্মী মো. রুবেলকে হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে মামলাটিতে ২৮ নম্বর আসামী করা হয় মাগুরা-১ আসনের সাবেক এই সংসদ সদস্যকে।

এছাড়াও তার নামে চেক প্রতারণা ও শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির মামলা আছে।

সাক্ষাৎকারে ক্রিকেট ক্যারিয়ার ও রাজনৈতিক জীবনের ভবিষ্যৎ, আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা, জুলাই আন্দোলন, বিসিবিতে পালাবদল, নিজের পরিবার এবং আরও অনেক কিছু নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন ৩৯ বছর বয়সী অলরাউন্ডার। তা থেকে  কিছু অংশ দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো

এত কাছে (মুম্বাই) এসে দেশে ফেরার ইচ্ছে তীব্র হয় কি না এমন প্রশ্নে সাকিব আল হাসান বলেন, ‘এরকম চিন্তা করিনি আসলে। যখনই এসেছি, জানতাম যে এখানে কাজে এসেছি এবং ওই ভাবনা নিয়েই এসেছি যে, কাজ শেষে আবার চলে যাব। রিটার্ন টিকিটও করা ছিল সব সময়।’ তবে দেশে ফেরার আলোচনা একসময় বেশ ছিল। ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগও হতো। তবে সে আলোচনা এখন একদমই নেই।

বিশ^কাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের না খেলার সিদ্ধান্তটা সরকারের একটা ব্লান্ডার ছিল বলে মনে করেন সাকিব আল হাসান। মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদ বা পদক্ষেপ বাংলাদেশের কী হতে পারত এমন প্রশ্নে সাকিব বলেন, প্রথমত হচ্ছে বিসিসিআই কিংবা কলকাতা নাইট রাইডার্স, যারাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে (মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া), এটার অনেক রকম উপায় ছিল, যেটাতে সুন্দরভাবে সমাধান হতে পারত। কেন তারা সুন্দরভাবে সিদ্ধান্ত নেয়নি, উত্তরটা আমার জানা নেই। কারণ আমার ক্ষেত্রে এরকম হয়েছে যে, বাংলাদেশের সিরিজের কারণে তখন আইপিএলে খেলতে পারব না, তখন ওরাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে যে, আমি নিজে থেকেই সরে দাঁড়ালে ওদের কাজটা সহজ হয়। পারস্পরিক সমঝোতায় সেভাবেই করেছি। মুস্তাফিজের সঙ্গেও তারা সেভাবে করতে পারত।

দ্বিতীয়ত, মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর দুই বোর্ড কথা বলতে পারত যে, ‘একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, আমরা নিজেদের মধ্যে সমাধান করে নিই।’ আলোচনায় অবশ্যই সমাধান হতো।

এটা তাদের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট। তারা যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। সমস্যা লেগেছে তাদের সঙ্গে, আমি যুদ্ধ লাগিয়ে দিলাম আইসিসির সঙ্গে, এটা তো কাজের কথা হলো না। এখানে পলিটিক্যাল গেম খেলা হয়েছে এবং মানুষের আবেগকে পুঁজি করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করেছে ওই সময়ের সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

এ ব্যাপারে বিসিবির করণীয় সম্পর্কে সাকিব বলেন, ‘বোর্ড এখানে শক্ত অবস্থান নিতে পারত, যা তারা নেয়নি। একটা ব্যাপার হলো, সরকারের কথা তাদেরকে মানতেই হবে। তবে বোর্ডেরই দায়িত্ব সরকারকে বোঝানো। যেভাবেই হোক, তারা বোর্ডকে বোঝাবে যে, বিশ্বকাপে না গিয়ে আমরা নিজেদের ক্ষতি করতে পারি না। জানি না, বুলবুল ভাই (তখনকার বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল) কেন এসব করেননি, জানি না। আমার মনে হয়, বুলবুল ভাইয়ের সভাপতির দায়িত্ব হারানোর পেছনে এটাও একটা বড় কারণ। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে গেলে হয়তো তিনিই সভাপতি থাকতেন এখনও। যদিও এটা স্রেফ আমার ধারণা।’ সাকিব বলেন, ‘আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের তো কারও শত্রু হওয়ার প্রয়োজন নেই। অবশ্যই আমরা হাত কচলাব না, নতজানু হব না, তবে শত্রু কেন বানাব? আমার এত বছরের ক্যারিয়ারে প্রথমবার দেখলাম, আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে অন্য কোনো বোর্ডের ঝামেলা।’

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কেমন করছে এ প্রশ্নে সাকিব বলেন, ‘দল তো ভালোই করছে। তবে আমার মনে হয়, কঠিন প্রতিপক্ষ সেভাবে পাচ্ছে না। দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোয় তো এখন অনেক সময়ই দলগুলো তাদের সেরা দল খেলায় না বা খেলাতে পারে না নানা কারণে। বিশ্বকাপে না যাওয়ায় এখানেও একটা বড় ক্ষতি হয়েছে। টি-টোয়েন্টি দলটা এমনিতে ভালো খেলছে। কিন্তু সত্যিকারের পরীক্ষা হচ্ছে না ওদের। বিশ্বকাপে গেলে সত্যিকারের পরীক্ষা হতো যে, আসলেই কতটা ভালো দল। বোঝা যেত কোন জায়গায় দলটা আসলেই ভালো, কোন জায়গায় উন্নতি করতে হবে। দলের পারফরম্যান্সকে আমি খাটো করছি না। টি-টোয়েন্টি দল ভালো খেলছে, ওয়ানডে দল তো টানা কয়েকটি সিরিজ জিতেছে।’

এই দলে জায়গা করে নিতে পারবেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সবশেষ যে টুর্নামেন্টগুলো খেলেছি, আমার মনে হয় ভালোই করেছি। সিপিএলে আমাদের দল মোটেও ভালো ছিল না। তার পরও প্লে-অফে খেলেছি। কানাডায় সুপার সিক্সটিতে ফাইনালে খেলেছি। গ্লোবাল টি-টোয়েন্টিতে ফাইনালে খেলেছি। আমার পারফরম্যান্স তো দেখেছেনই আপনারা। এই কারণে আত্মবিশ্বাস আছে যে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেললে খারাপ খেলব না।

হ্যাঁ, যেটা লাগবে, এক মাস ট্রেনিং লাগবে। ফিটনেস ট্রেনিংসহ সবকিছু এক মাস করলেই হবে। আবহাওয়া, মাঠ, সবকিছুর সঙ্গে একটু মানিয়ে নিতে হবে। এই তো।

আর যদি দেখি দুটি সিরিজে পারফর্ম করতে পারলাম না, খেলা ভালো হচ্ছে না, বিদায় নেব তখন। এমন তো নয় যে খেলতেই থাকব বা দলের বোঝা হয়ে থাকব। দলের বোঝা হয়ে ওঠার আগে নিজেই উপলব্ধি করব এবং ছেড়ে দেব।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ক্রীড়াবিদরা যেন ক্যারিয়ার চলার সময় রাজনীতিতে না জড়ান। আপনার কী মনে হয়? এ প্রশ্নে সাকিব বলেন ‘উনার ভাবনা আমি শ্রদ্ধা করি। অবশ্যই উনার কথায় যুক্তি আছে।

রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী এমন এক প্রশ্নে সাকিব বলেন ‘রাজনীতির জন্য আজীবন সময় আছে। আপাতত ক্রিকেট খেলে নিচ্ছি।’

জাতীয় দলে সাকিবের সতীর্থ ও বর্তমানে বিসিবির অ্যাডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবালের দেওয়া ক্যাপ্টেনস কার্ড নিয়ে সাকিব বলেন, ‘এসব ব্যাপারে আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই। যেটা হচ্ছে যে, ক্রিকেটারদের ক্যাপ্টেনস কার্ডের মাধ্যমে আলাদা করাটা ঠিক নয়। অনেকেই ক্রিকেটার হিসেবে অনেক ম্যাচ খেলেছে, কিন্তু অধিনায়কত্ব পাচ্ছে না বলে এই সুবিধাটা পাচ্ছে না। আরেকজন আবার বেশি ম্যাচ না খেললেও এক ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেই এটা পাচ্ছে। সেই জায়গা থেকে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে। আবার এটাও ঠিক, সম্মান তো সম্মানই। ক্রিকেটে অধিনায়কের আলাদা জায়গা থাকে এবং সম্মান দেওয়াও ঠিক আছে।

তবে সব ক্রিকেটারকেই সম্মানটা দেওয়া উচিত। সম্মানটা তাদের প্রাপ্য এবং সেটা পেলে তারা খুশি হয়। সবাইকে যতটা সম্ভব সমান ধরনের সুযোগ দেওয়া উচিত।