প্রতিশোধ নিতে মরিয়া ইরান, জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক

ইরানের রাজপথে এখন সর্বত্রই নিহত নেতা এবং নতুন শাসকদের ছবি। টেলিভিশনের পর্দা থেকে শুরু করে দেয়াল- সবখানেই বর্তমান শাসনব্যবস্থার আধিপত্য। সাম্প্রতিক যুদ্ধ, বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে দানা বাঁধছে এক নতুন আতঙ্ক। অনেক ইরানিই মনে করছেন, যুদ্ধের ডামাডোলে দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং তারা এখন বিরোধীদের ওপর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া।

বিবিসির সংগৃহীত তথ্যে উঠে এসেছে তেহরানের বর্তমান পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র। দেশটির ভেতরে থাকা সাধারণ নাগরিক, মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে।

তেহরানের বাসিন্দা সানা ও দিয়াকো (ছদ্মনাম) জানান, তারা আশা করেছিলেন যুদ্ধের ফলে হয়তো কট্টরপন্থী শাসনের অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সানা বলেন, ‌‘শুরুতে ভেবেছিলাম বড় নেতাদের পতনে হয়তো পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এখন দেখছি রিভল্যুশনারি গার্ডসের হাতে সব ক্ষমতা চলে গেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।’

ওয়াশিংটনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হারানা-র তথ্যমতে, গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৫৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালীন রাজনৈতিক বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার হার গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্তত ২১ জন বন্দিকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ৯ জন জানুয়ারি বিক্ষোভের সাথে যুক্ত ছিলেন।

পেশায় আইনজীবী সুজান (ছদ্মনাম) জানান, যুদ্ধের সময় বন্দিদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়েছে। তিনি বলেন, আগে যারা সশস্ত্র ছিল কেবল তাদের ওপর কঠোরতা দেখানো হতো, কিন্তু এখন সাধারণ প্রতিবাদকারীদেরও রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হলে সরকার বন্দিদের ওপর এই যুদ্ধের সমস্ত ক্ষোভ উগড়ে দেবে এমনটাই আমাদের আশঙ্কা।

পারিবারিক বিভাজনের এক চিত্র ফুটে ওঠে সুজানের কথায়। তার বাবা-মা কট্টর সরকার সমর্থক হলেও ভাই ঘোর বিরোধী। এমনকি পরিবারের মধ্যেও এখন এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে।

ইরানে বর্তমানে স্বাধীন সাংবাদিকতা এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। আরমিন (ছদ্মনাম) নামে এক সাংবাদিক জানান, আগে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হতো এমন প্রতিবেদনকে এখন গুপ্তচরবৃত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানি আইনে গুপ্তচরবৃত্তির সাজা মৃত্যুদণ্ড। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে ভাবতাম, আর এখন কেবল নিজে এবং পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাই।’

বর্তমানে ইরানের রাজপথে বিরোধীদের কোনো অবস্থান নেই। সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ বছর এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের অজুহাতে সরকার অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা পুরোপুরি রুদ্ধ। অনিশ্চয়তা আর ভয়ের চাদরে ঢাকা পড়েছে সাধারণ ইরানিদের ভবিষ্যৎ।

সূত্র: বিবিসি