কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতি ব্যবহারে জমির উর্বরতা হ্রাসের আলোচনা দীর্ঘদিনের। এ থেকে উত্তরণে গবেষণা ও কারিগরি সহযোগিতা করবে মরক্কো। এ লক্ষ্যে দুই দেশের সরকারের মধ্যে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায় তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশে সার ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কাজ করবে মরক্কোর ওসিপি ফাউন্ডেশন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি ও বেসরকারিভাবে মরক্কো থেকে সার আমদানি করে। ক্রেতা দেশের সঙ্গে ভালো বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে ওসিপি ফাউন্ডেশন তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে সমস্ত ব্যয় বহন করবে। দুই দেশের এই উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়নের জন্য কৃষি উদ্ভাবন জোরদার।’
চুক্তির আওতায় তিনটি জেলায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। যেখানে চাল, ভুট্টা, ডালসহ মোট ১২টি শস্যের জমি নিয়ে গবেষণার কাজ চলবে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওসিপি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয় গত ফেব্রুয়ারিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরু করতে একটি প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যেই ঢাকায় পৌঁছেছে। এই দলটিকে নিয়ে আজ মন্ত্রণালয়ে একটি কারিগরি বৈঠক হবে। যেখানে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। একই দিন সন্ধ্যায় মরক্কোর প্রতিনিধিদল আরও একটি বৈঠক করে প্রাথমিকভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন রূপরেখা চূড়ান্ত করবে।
জানা গেছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় আগামী ২০২৯ সাল পর্যন্ত তিন বছরে নির্বাচিত জেলাগুলোতে ক্ষুদ্র কৃষকদের নিয়ে কাজ করবে প্রতিষ্ঠানটি। এ সময়ে মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কোন অঞ্চলের জমিতে কতটুকু সার প্রয়োগ করা দরকার তা নির্ণয়ে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দেবে ওসিপি ফাউন্ডেশন।
তথ্যমতে, সার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে কৃষকরা প্রায় সব ফসলে অতিরিক্ত ও ভারসাম্যহীন সার ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে ইউরিয়া সার বেশি ব্যবহার হচ্ছে। এতে মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিয়েছে। আশা করা হচ্ছে, মরক্কোর এই কর্মসূচির মাধ্যমে জমির সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, মাটির পরীক্ষা এবং নির্ভুল সার প্রয়োগের মাধ্যমে এসব কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলা করা হবে।
কর্মসূচির আওতায় সরাসরি প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার কৃষক উপকৃত হবেন বলে জানা গেছে। জ্ঞান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে আরও ৩০ হাজারের বেশি কৃষক পরোক্ষভাবে লাভবান হবেন। এ ছাড়া ১৫০ জনের বেশি কৃষককে অঞ্চলভিত্তিক লিডারশিপ হিসেবে তৈরি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, কর্মসূচিতে মোট আটটি প্রধান উপাদান রয়েছে। যার মধ্যে প্রাথমিক জরিপ, মাটি পরীক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, পরীক্ষামূলক সার ব্যবহার, প্রদর্শনী প্লট, কৃষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল
কৃষি প্রযুক্তি এবং সামাজিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ। প্রথম ধাপে একটি সমন্বিত গবেষণার মাধ্যমে মাটির অবস্থা ও কৃষিচর্চার মানচিত্র তৈরি করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি ও মাটি পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা হবে এবং সম্প্রসারণ-কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা হবে।
দেশব্যাপী ১৮০টি ক্লাস্টারে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করে ফসল বহুমুখীকরণ ও সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনার উন্নত পদ্ধতির প্রয়োগ করা হবে। ফার্মার ফিল্ড স্কুল এবং ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবছর এক হাজারের বেশি কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মাটির পুষ্টি, আবহাওয়া এবং বাজারদরের বিষয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য প্রদান করা হবে, যাতে কৃষকরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।