লেবাননে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পার হলেও থামেনি রক্তক্ষয়। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ হামলায় গত সোমবারই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৭ জন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত মাত্র পাঁচ দিনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১০ জনে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবারের হামলায় নিহতদের মধ্যে দুইজন শিশু এবং আহতদের মধ্যে ১৪ জনই শিশু। তবে হতাহতদের মধ্যে কতজন বেসামরিক নাগরিক আর কতজন সশস্ত্র যোদ্ধা, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, একই সময়ে হিজবুল্লাহর রকেট ও ড্রোন হামলায় ১৭ জন ইসরায়েলি সৈন্য নিহত হয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে।
সোমবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আভিচাই আদরাই বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্তত ১ কিলোমিটার দূরে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই গ্রামগুলো তথাকথিত ইয়েলো লাইন-এর বাইরে অবস্থিত। ইসরায়েল এই এলাকাটিকে তাদের নিরাপত্তা বলয় হিসেবে দাবি করে এবং তাদের মতে, এটি যুদ্ধবিরতির শর্তের আওতাভুক্ত নয়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অবস্থান হলো, কোনো সম্ভাব্য বা আসন্ন আক্রমণ ঠেকাতে তারা পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রাখে। তবে লেবাননের কর্মকর্তারা এই ব্যাখ্যার তীব্র বিরোধিতা করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছেন।
এদিকে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলার কথা স্বীকার করেছে। তারা দক্ষিণ লেবাননের নাকুরায় ইসরায়েলি সেনাদের ওপর ড্রোন হামলা এবং দক্ষিণ-পূর্বের কানতারায় রকেট নিক্ষেপ করেছে। হিজবুল্লাহর দাবি, দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলোতে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের পাল্টা জবাব হিসেবেই তারা এই হামলাগুলো চালিয়েছে। এছাড়া তারা কামিকাজে ড্রোন ও কামানের গোলা ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর ড্রোন সক্ষমতাকে একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে স্বীকার করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই সমস্যা মোকাবিলা করতে সময় লাগবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম সরাসরি রাষ্ট্রদূত-পর্যায়ের বৈঠক হলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো আলোচনার আগে ইসরায়েলকে পূর্ণাঙ্গভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। সোমবার সকালে এক ভাষণে তিনি বলেন, এই সরাসরি আলোচনা হলো কোনো ফলাফল ছাড়াই একটি ছাড় দেওয়া, যা কেবল নেতানিয়াহুর বিজয়ের ভাবমূর্তি তৈরি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের স্বার্থ রক্ষা করছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই দফায় সংঘাতে এ পর্যন্ত দেশটিতে ২,৬০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে হিজবুল্লাহর একজন সদস্য বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে তাদের ১,০০০-এর কম যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
মধ্যস্থতাকারীদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উভয় পক্ষের অনড় অবস্থান। হিজবুল্লাহ মনে করছে আলোচনা কেবল প্রতিপক্ষেরই লাভ করবে, আর ইসরায়েল মনে করছে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: বিবিসি