টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চলে এখন শুধুই হাহাকার। চোখের সামনে তলিয়ে গেছে সোনালী স্বপ্ন। কাউয়াদিঘি ও হাকালুকি হাওরের বিস্তীর্ণ জনপদে পাকা ও আধাপাকা ধান এখন পানির নিচে। যেখানে উৎসবের আমেজে ধান কাটার কথা ছিল, সেখানে এখন পচা ধানের দুর্গন্ধ আর কৃষকের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে আকাশ-বাতাস।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে, এই আকস্মিক দুর্যোগে জেলায় প্রায় ৪৫ কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। সরকারি হিসেবে অন্তত ১৮ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যদিও মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও দীর্ঘ হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার চারিদিকে এখনও শুধু পানি আর পানি। কোথাও কোথাও পচা ধানের স্তূপ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দীর্ঘদিনের বৃষ্টিপাতের পর মঙ্গলবার সূর্য উঠলে অনেক কৃষক মাঠে থাকা ধান রোদে শুকানোর চেষ্টা করেন। কেউ কেউ আবার পচে যাওয়া ধান মাড়াই করে নেন। রাজনগরের কৃষক মজর মিয়া বলেন, ২৫ বিঘা জমির মধ্যে মাত্র ৪-৫ বিঘার ধান তুলতে পেরেছেন। বাকি ধান কাটার লোক বা যন্ত্র কোনোটাই সময়মতো মেলেনি।
হাওরপাড়ের কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে পর্যাপ্ত শ্রমিক এবং কম্বাইন্ড হারভেস্টার না পাওয়ায় তারা সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। সদর উপজেলার বিরইমাবাদের কৃষক পঙ্কি মিয়া বলেন, ২০ বিঘা জমিতে চাষ দিছিলাম, মাত্র ৩ বিঘার ধান কাটতে পারছি। বাকি সব পানির নিচে। বুকসমান পানিতে এখন আর কেউ নামতে চায় না। আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি।’ একই আর্তনাদ শোনা গেল নজরুল ইসলাম ও মুকিত মিয়ার কণ্ঠে। কাউয়াদিঘি হাওরের লামার বাঁধ এলাকায় তাদের ৯০ বিঘা জমির ধান এখন পচছে পানির নিচে। তারা আক্ষেপ করে বলেন, ‘সারা বছরের খোরাকি পানির নিচে চলে গেছে। এখন কী খাব, তা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘আকস্মিক ঢলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তবে সরকারি ও কৃষকদের পরিসংখ্যানে কিছুটা ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী হাওরে ধান কাটার হার অনেক বেশি হলেও কৃষকদের দাবি ভিন্ন। পূর্ণাঙ্গ হিসাব না আসা পর্যন্ত চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তবে ১৮ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি।’