রহস্যময় কুঠিবাড়ি

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার রহস্যময় ক্যাসপারের কুঠিবাড়ি এখন প্রায় ধ্বংসের পথে। জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে মঠবাড়িয়ায় সাপলেজা ইউনিয়নে বিশাল জায়গাজুড়ে নির্মিত এই কুঠিবাড়ির প্রাসাদ। এর প্রতিটি ইটে লুকিয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আঠারো শতকের গোড়ার দিকে জনৈক ইংরেজ এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার সোয়া ৯ একর জমির ওপর এ কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। কথিত আছে, ক্যাসপার সাপলেজা এলাকা ভ্রমণকালে স্থানীয় ধনাঢ্য ফরাজউল্লাহ তাকে সম্মানিত করতে ওই জমি উপহার দেন। পরবর্তীকালে এখানে ক্যাসপারের জমিদারি সম্প্রসারিত হয়।

কুঠিবাড়ির মূল ভবন নির্মাণে প্রচলিত ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতিতে চৌকোনাকৃতির ১৮টি খিলানের ওপর দোতলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত ছিল। এ ছাড়া ছিল অন্য স্থাপনা ও বড় একটি পুকুর। কুঠিবাড়ির ওপরের তলায় ক্যাসপারের ব্যবহৃত মূল্যবান সামগ্রী ও তৈজসপত্র ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ব্রিটিশরা চলে গেলে এই ভবন ও সম্পত্তি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অজ্ঞাত কারণে ভেঙে দেওয়া হয় মূল ভবনটির দোতলার সম্পূর্ণ অংশ। তখন দোতলায় রক্ষিত মূল্যবান মালপত্র বেহাত হয়ে যায়।

লিখিত আকারে এই ভবনের বিস্তারিত ইতিহাস না পাওয়ায় এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার, তার জমিদারি, ব্যক্তিগত জীবন, ভবনের নির্মাণশৈলী সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ক্যাসপারের ব্যবহৃত যে দুটি তরবারিসহ কিছু তৈজসপত্র ছিল, তাও এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। বর্তমানে কুঠিবাড়িটি প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির সামনে শানবাঁধানো ঘাটসহ পুকুরটি জৌলুশহীন।

কুঠিয়াল ক্যাসপার এখানে বসবাস করতেন না। তবে অতি বিশ^স্ত কর্মচারী সুরেশ চন্দ্র সুর ও সতীশ চন্দ্রের মাধ্যমে তিনি জমিদারি পরিচালনা করতেন। ক্যাসপারের একটি বড় নৌকা ছিল। এ নৌকায় করেই তিনি শীত মৌসুমে তৎকালীন চন্দ্রদ্বীপ [বর্তমান বরিশাল] থেকে কুঠিবাড়িতে আসতেন। খাজনা আদায় করে আবার শীত শেষে চলে যেতেন। ফসল তোলা শেষ হলে জমিদার ক্যাসপার নির্দিষ্ট দিনে খাজনা সংগ্রহ করে চলে যেতেন। ক্যাসপারের উপস্থিতিতে প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষভাগে কুঠিবাড়িতে পুণ্যাহ উৎসব উপলক্ষে খাজনা আদায়সহ প্রজাদের মনোরঞ্জনের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এর মধ্যে জাদু প্রদর্শনী, লোকগান, যাত্রা ও নিমাই সন্ন্যাসী পালায় প্রচুর লোকসমাগম হতো।

ক্যাসপার যেহেতু শীত মৌসুমে এখানে অবস্থান করতেন, তাই ভবনটিকে গরম রাখার জন্য বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। মূল ভবনের নিচে চার কোণে কয়লার আগুন রাখার ব্যবস্থা ছিল। নায়েব, পাইক-পেয়াদাদের থাকার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল আরেকটি ভবন। দ্বিতল ভবনটির নিচতলায় অফিসকক্ষে বসে এলাকার খাজনা আদায় ও বিচারকাজ পরিচালনা করা হতো।

ক্যাসপার চলে যাওয়ার আগে সাপলেজা এলাকার নাম তার বাবা শিলার সাহেবের নামে নামকরণ করেন। স্থানীয় ডাকঘরটি এখনো শিলারগঞ্জ নামে পরিচিত। দেশ ভাগের পর সেই সময়ের প্রশাসন প্রথমে ক্যাসপারের মূল বাড়ি সংস্কার ও পরিবর্তন করে ইউনিয়ন ভূমি অফিস [তহশিল অফিস] হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই ভবনের পাশে নতুন ভূমি অফিস ভবন নির্মাণ করায় ক্যাসপারের বাড়িটি ব্যবহারের উপযোগিতা হারায়। বর্তমানে ক্যাসপারের বাড়িটি পরিত্যক্ত।

স্থানীয়রা জানান, সরকার কুঠিবাড়ির মালিকানা নিলেও এর রক্ষণাবেক্ষণের তেমন উদ্যোগ নেয়নি। সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক নিদর্শন প্রতœসম্পদ সাপলেজা কুঠিবাড়ি। বর্তমানে কুঠিবাড়ির তিনটি ভবন জরুরি সংস্কার করা না হলে মূল ভবনটিসহ সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রকাশনা বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. গোলাম ফেরদৌস জানান, এটি সংরক্ষণের জন্য একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এখনো গেজেট হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।