ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণকে তাদের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। এটি মূলত ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় এবং দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি বড় পরিকল্পনা।
ক্ষমতায় আসার পর এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী জাতীয় অর্থনৈতিক কমিশনের (একনেক) বৈঠকে পদ্মা ব্যারেজের বিষয়টি উত্থাপন করা হবে। সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর শুরু হবে এর বাস্তবায়ন। গতকাল বুধবার এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
এদিকে গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠকের পর পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশের পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের স্টাডি রিপোর্ট, সমীক্ষা ও সম্ভাবত্য জরিপ শেষ হয়েছে, শিগগির প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক কমিশনের উপস্থাপন হবে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। এই প্রজেক্টটা খুব শিগগিরিই একনেক সভায় উপস্থাপন হবে, আলোচনা হবে এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।’
এর আগে সকাল ১০টায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পানি সম্পদ ব্যবস্থার এই সভা হয়। ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে খাল-খনন, শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিতকরণ, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। তিনি বলেন, ‘সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়ক সভায় শুষ্ক মৌসুম পানি সমস্যা সমাধানের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা যাতে জমিতে সেচের সুবিধা পায়, সারাদেশে চলমান খাল খনন কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’
ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকের পরে সাংবাদিকদের কাছে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহিদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরে বলেন, ‘আপনারা জানেন বাংলাদেশের সচেয়ে বড় প্রজেক্ট পদ্মা ব্যারেজ সেটার স্টাডি রিপোর্ট, কারিগরি দিক, সমীক্ষা প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। একনেক সভা যেদিন হবে সেদিন প্রকল্পটি উপস্থাপন হবে। তার আগ পর্যন্ত আমাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কি কি কাজ সম্পন্ন করা দরকার ইমিডিয়েট সেটা নিয়ে আমরা বিশেষ আলোচনা করেছি।’
কারণ হিসেবে মন্ত্রী বলেন, ‘এই পদ্মা ব্যারেজটি বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ জনগণের সুবিধার্থে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিধায় আমরা আমাদের যে নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে এই প্রজেক্টটি নিয়ে কথা বলেছেন, প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রজেক্টে আমাদের নর্থ বেঙ্গলের প্রায় ২৪ জেলার জনসাধারণ খুব বেশি উপকৃত হবেন এবং সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো যে এটা বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রয়োজন। শুধু ইরিগেশন নয়, সকল দিক বিবেচনায় জনস্বার্থে এই প্রজেক্টটি সারা বাংলাদেশের পানির প্রবাহ সুগর্ভস্থ পানির লেভেল, মৎস চাষ এবং কৃষি প্রধান এলাকা হিসাবে সবদিকে সবাকে আমরা কীভাবে সমন্বয় করতে পারি সেই দিকে আমরা বিশেষ নজর দিয়েছি।’
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প ছাড়াও তিস্তা প্রজেক্ট নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রজেক্টটি নিয়েও প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছে। যেহেতু এটার ফিজিবিলিটি স্টাডি ইতিমধ্যে চলছে। আরও বেশি স্টাডি করতে হবে। কারিগরি দিক, সমীক্ষা সবকিছু বিবেচনা করে আমরা কি বেনিফিট দিয়ে ওই এলাকার মানুষ, দেশবাসীকে আমরা সম্পৃক্ত করব সেই বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, খাল-খনন কর্মসূচি চলমান রয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে চাঁদপুর ও ফেনীতে খাল-খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আগামী ১৬ মে চাঁদপুরে প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন। সেখানে অনেকগুলা কর্মসূচির মধ্যে খাল খনন কর্মসূচিও থাকছে এবং সেখানে তিনি খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। সারা বাংলাদেশে ইতিমধ্যে যেসব জেলা তিনি যাচ্ছেন খাল খনন কর্মসূচিকে প্রায়োরিটি দিচ্ছেন। আমরা আগামী পাঁচ বছরব্যাপী সারা বাংলাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। সে অনুযায়ী তিনি ইতিমধ্যে কয়েকটা জেলায় গিয়ে খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী।’
মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রী-এমপি সাহেবরা সবাই যার যার এলাকায় এই কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। যেহেতু বর্ষাকাল প্রায় চলে এসেছে। হয়তোবা আমরা এই মে মাস পর্যন্ত এই কর্মসূচি কন্টিনিউ করতে পারবো। বর্ষা শেষে আবার আগামী নভেম্বর ডিসেম্বর জানুয়ারির দিকে আমরা এই খালখনন কর্মসূচি আমরা কন্টিনিউ করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমের আগে মে মাসে প্রধানমন্ত্রী দুইটা জেলায় যাচ্ছেন সেটা হলো চাঁদপুর এবং ফেনী। ফেনীতে যাবেন ২৫ মে এবং চাঁদপুর যাচ্ছেন ১৬ মে।’
সংসদে পদ্মা ব্যারেজ : গত ১৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছিলেন, পদ্মা অববাহিকার বিশাল কৃষি অঞ্চলকে মরুময়তা থেকে বাঁচাতে ও শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে বিস্তৃত এবং যেখানে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষ বসবাস করে। প্রকল্পটি নদী নির্ভরশীল জনগণের জীবন রক্ষাকারী প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত।’
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের ধারণা দীর্ঘদিনের। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রকল্পটি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে মোট চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। পরবর্তীতে ২০০২ সালে প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়। ২০০৪ সালে ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যা ২০১৩ সালে সম্পন্ন হওয়ার পর, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নকশা চূড়ান্ত করা হয়।’
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পের ডিপিপি ইতোমধ্যেই প্রণয়ন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সাল থেকে জুন ২০৩৩ পর্যন্ত।’
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও স্থান সম্পর্কে মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, এই ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত চারটি সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিস্তারিত সমীক্ষা শেষে রাজবাড়ীর পাংসা পয়েন্টকে ব্যারেজ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে এই প্রকল্পটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং সরকার নিজস্ব অর্থায়নে কাজ শুরু করার প্রাথমিক পরিকল্পনা করছে।
তিস্তা ব্যারেজ থেকে আরও যেসব সুবিধা পাওয়া যাবে সেগুলো হলো: এই ব্যারেজ থেকে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। প্রকল্প চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা রোধ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।