ভারতের ৭২ শতাংশ বিজেপির দখলে

২৬ মে, ২০১৪ প্রথমবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে ক্ষমতায় আসেন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি। দেশটিতে দীর্ঘদিনের কংগ্রেস শাসনের পতন ঘটানোর পর থেকে ভারতীয় রাজনীতি একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে বিজেপির। টানা তিন মেয়াদে কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের পর কট্টর হিন্দুত্ববাদী দলটি বর্তমানে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিজেপি। এর মধ্য দিয়ে ভারতে ২১টি রাজ্য নিজেদের দখলে নিল নরেন্দ্র মোদির দল, যা ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের প্রায় ৭২ শতাংশ; অথচ ১২ বছর আগে বিজেপির হাতে ছিল মাত্র সাতটি রাজ্য।

ইন্দিরা গান্ধীর আমলের কংগ্রেসের পর এ দেশে আর কোনো দল বা জোট এমন শক্তিশালী ফেডারেল অবস্থান অর্জন করতে পারেনি। গত ৪ মে’র ফলাফল ছিল সেই ধাঁধার শেষ অংশ, যা দলটি গত দুই বছর ধরে মেলাচ্ছিল। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক জয়, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস গত দেড় দশক ধরে অজেয় মনে হচ্ছিল; পাশাপাশি আসামে টানা তৃতীয় বিজয় বিজেপি’র। ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, এনডিএ’র পদচিহ্ন এখন ভারতের স্থলভাগের প্রায় ৭২ শতাংশ এলাকাজুড়ে রয়েছে। উত্তরাখণ্ডের পাহাড় থেকে শুরু হয়ে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গাসাগরে মিশে যাওয়া গঙ্গা নদীটি সম্পূর্ণভাবে এনডিএ শাসিত রাজ্যগুলোর ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। এটি শুধু ভৌগোলিক সংযোগ নয়, বরং এক দশকের নিরন্তর রাজনৈতিক পরিশ্রমের ফল।

২০১৪ সাল থেকে দলটির বিস্তারের একটি সুনির্দিষ্ট ধরন ছিল। এটি হিন্দিবলয় থেকে শুরু হয়েছিল, তারপর জোট গঠন ও স্থানীয় সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বে নিজেদের বিস্তার ঘটায় এবং ধীরে ধীরে সেই সব রাজ্যে নিজেদের পৌঁছে দেয়, যা দীর্ঘদিন তাদের নাগালের বাইরে বলে মনে করা হতো। মহারাষ্ট্র, উড়িষ্যার পর পশ্চিমবঙ্গ হলো এর স্পষ্ট উদাহরণ। যদিও ২০১৮ সালেও একবার বিজেপি ম্যাজিকে পিছিয়ে পড়েছিল বাকিরা। তবে সেই শীর্ষ অবস্থান এক বছরও টেকেনি; ওই বছরের ডিসেম্বরে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড় কংগ্রেসের কাছে হেরে যায় এবং এনডিএ’র রাজ্য সংখ্যা রাতারাতি ১৬-তে নেমে আসে। ২০২০ সাল নাগাদ আরও কিছু নির্বাচনী হার এবং মহামারীর কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতায় এই জোটের শাসন মাত্র ১৩টি রাজ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

দলটির এই সাফল্যের পেছেনে রয়েছে মৌলিক কাজ। বুথ স্তরের শক্তি বৃদ্ধি, জাতীয় গল্পের চেয়ে স্থানীয় ইস্যুগুলোর ওপর কড়া নজর এবং যেসব রাজ্যে তারা একা জিততে পারবে না, সেখানে জোট ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করে। মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, বিহার ও উড়িষ্যা একে একে তাদের অধীনে চলে আসে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে এই সংখ্যা ১৯টি রাজ্য ও দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পৌঁছায়। মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের ফলাফল তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়।

২১ সংখ্যাটির একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। সত্তরের দশকের শেষের দিকে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসও তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার তুঙ্গে থাকাকালীন সমসংখ্যক রাজ্য শাসন করত এবং তারপর থেকে আর কোনো দল বা জোট সেই ফেডারেল অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি, যা এখন সম্ভব হয়েছে। এই তুলনাটি যৌক্তিক হলেও, পূর্ণাঙ্গ নয়। ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস ওই আধিপত্য বজায় রেখেছিল এক কেন্দ্রিক এবং প্রতিদ্বন্দ্বীহীন দলীয় কাঠামোর মাধ্যমে। তবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ’র ২১টি রাজ্যের তালিকায় এমন বেশ কিছু সরকার রয়েছে, যা শুধু আঞ্চলিক অংশীদারদের কারণে টিকে আছে; যেমন বিহারে জনতা দল (ইউনাইটেড), অন্ধ্রপ্রদেশে তেলুগু দেশম পার্টি এবং নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়সহ উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন মিত্র দল। ২১টি রাজ্যের মধ্যে ১৫টিতে বিজেপি নিজস্ব শক্তিতে শাসন করছে, আর বাকি ছয়টি রাজ্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে জোটের প্রয়োজন হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ ভারত এখনো এই জোয়ারকে প্রতিহত করে চলেছে। কেরালা আবারও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছে। তামিলনাড়– গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে নাটকীয় নির্বাচনী ফলাফল উপহার দিয়েছে, যেখানে অভিনেতা-রাজনীতিবিদ বিজয়ের দল বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং বিজেপিকে উভয় রাজ্যে কোনো কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে দেয়নি।

এনডিএ’র এই বিশাল ফেডারেল উপস্থিতি তাদের নীতি নির্ধারণে প্রকৃত সুবিধা প্রদান করে। জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, অবকাঠামোসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক অগ্রাধিকারগুলো ভারতের একটি বিশাল এবং সংলগ্ন অঞ্চলে এমনভাবে সমন্বয় করা সম্ভব, যা কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে করা অসম্ভব। বিজেপি বারবার বিভিন্ন রাজ্যে প্রমাণ করেছে, তারা এই ধরনের সুশাসনকে টেকসই নির্বাচনী সমর্থনে রূপান্তর করতে পারে। তবে ঝুঁকিও সমানভাবে বিদ্যমান। ২১টি রাজ্য মানে হলো ২১টি আলাদা জবাবদিহিতার ক্ষেত্র। যে ভোটাররা দৃশ্যমান উন্নয়নের জন্য দলকে পুরস্কৃত করে, তারা দৃশ্যমান ব্যর্থতার জন্য সমান দ্রুততায় শাস্তিও দিতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে বছরের পর বছর ধরে গড়া সাফল্য মাত্র একটি নির্বাচনী মৌসুমে ধুয়ে যেতে পারে। বিজেপির বর্তমানে রাজনৈতিক শক্তি যেকোনো মানদণ্ডেই একটি বড় সাফল্য। তবে এটি এমন একটি অবস্থান, যা পুরস্কারের চেয়ে দায়িত্বের দাবি বেশি রাখে।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ : পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী ৯ মে শনিবার সকাল ১০টায় কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিজেপি। তবে বিধানসভা দলের নেতা হিসেবে এখনও কারও নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। নাম ঘোষণা করা না হলেও জল্পনাকল্পনা চলছেই। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন শুভেন্দু অধিকারী। এদিন শপথ নেবে রাজ্যের নতুন মন্ত্রিসভাও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত যেভাবে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে এ রাজ্য থেকে তৃণমূলকে হটিয়ে দিয়েছেন, তার পুরস্কার হিসেবে শুভেন্দুকেই মুখ্যমন্ত্রী করা হতে পারে।

এবার কলকাতার ভবানীপুর আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। এর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও মমতাকে হারিয়েছিলেন তিনি। তবে মন্ত্রিসভায় কারা থাকবেন, এ বিষয়ে আগামী ৮ মে অমিত শাহর সঙ্গে রাজ্য নেতৃত্বের বৈঠকের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জোটসঙ্গীর খোঁজে বিজয় : ভারতের তামিলনাড়– রাজ্যের রাজনীতিতে রীতিমতো ঝড় তুলেছেন তামিল সিনেমার সুপারস্টার থালাপাতি বিজয়। গত সোমবার প্রকাশিত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, তার নতুন রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেত্রি কাঝাগাম (টিভিকে) রাজ্যের ২৩৪ আসনের মধ্যে ১০৮টিতে জয়ী হয়েছে। সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ১১৮টি আসন। অর্থাৎ, মুখ্যমন্ত্রী হতে আর ১০টি আসন প্রয়োজন বিজয়ের। নির্বাচনে পাঁচটি আসন জেতা কংগ্রেস এরই মধ্যে জানিয়েছে, সরকার গঠন করতে বিজয়কে সমর্থন দেবে তারা। সরকার গঠনের লক্ষ্যে গত সোমবারই বিজয় চেন্নাইয়ের রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় বিজয় ও তার প্রতিনিধিদল রাজ্যপালের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের দাবি পেশ করেন।

এদিকে, সদ্য ক্ষমতাচ্যুত ডিএমকে সংসদ সদস্য কানিমোঝি বলেন, জনগণের রায়ই চূড়ান্ত এবং একে অবশ্যই শ্রদ্ধা করতে হবে। ডিএমকে এই ফলাফল মেনে নিচ্ছে এবং বিজয় ও নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় না থাকা মানেই রাজনৈতিক দায়িত্ব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। ডিএমকে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার থাকবে, মানুষের কল্যাণে লড়াই করবে এবং তামিলনাড়–তে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে কাজ করবে।