বিশ্বশিল্পের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে বাংলাদেশের নাম সগৌরবে খোদাই করেছেন এমন হাতেগোনা কয়েকজন শিল্পীর মধ্যে মনিরুল ইসলাম অন্যতম। স্পেন এবং বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে তিনি ‘মনির’ নামেই সমধিক পরিচিত। এচিং বা ছাপচিত্রের জগতে নিজস্ব শৈলী এবং নিরীক্ষাধর্মী কৌশলের জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব। স্পেনে দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটালেও তিনি বিশ্বজুড়ে শিল্পকলার বৈশ্বিক ভাষার সঙ্গে বাংলার মাটির নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করেছেন।
ব্রিটিশ ভারতের ১৯৪৩ সালের ১৭ আগস্ট তার জন্ম হয়। তথ্যসূত্রে তার জন্মস্থান হিসেবে কখনো চাঁদপুর আবার কখনো ময়মনসিংহের ইসলামপুরের কথা উঠে এসেছে। শিল্পকলার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে অধ্যয়ন করেন, যেখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এবং কিংবদন্তি শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন তার শিক্ষক ও গুরু। শিক্ষাগ্রহণ শেষে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে এক বছর শিক্ষকতাও করেন।
স্পেন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বৃত্তি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই বৃত্তির সুবাদে তিনি স্পেনে পাড়ি জমান এবং ‘এসকুয়েলা দে বেয়াসার্তেস দে সান ফেরনান্দো’ থেকে ম্যুরাল পেইন্টিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। সত্তর দশকের শুরুতে স্পেনে এচিংয়ের মাধ্যমে তিনি প্রথম বড় সাফল্য পান। সেখানে তিনি ‘গ্রুপো কিনসে’-এর সঙ্গে যুক্ত হন, যা তাকে আন্তোনিও সাউরা, লুসিও মুনিয়োস এবং আন্তোনি তাপিয়েসের মতো বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। এই সময়ে তিনি আন্তোনিও লরেঞ্জোর কর্মশালার পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেন।
ছাপচিত্রে তার উদ্ভাবিত ‘ফ্রি-বাইট’ কৌশলটি স্পেনের শিল্পজগতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। জলরঙের মতো দেখতে এচিংয়ের এই বিশেষ কৌশলটি সেখানে ‘এসকুয়েলা দে মনির’ বা ‘মনিরের স্কুল’ নামে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। তার শিল্পকর্মে শূন্যস্থান এবং সূক্ষ্ম রেখার এক অপূর্ব ভারসাম্য লক্ষ করা যায়। রঙের ছন্দ এবং গ্রাফিক্সের মাধ্যমে তিনি ক্যানভাসে আধ্যাত্মিক সংবেদনশীলতা ও জীবনের বৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তোলেন। তার মতে, নিজের কাজে নতুনত্ব আনতে হলে শিল্পীকে বারবার নিজের তৈরি করা ছক ভাঙতে হয়।
মানুষ মনিরুল ইসলাম অত্যন্ত সহজ-সরল এবং বিনয়ী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। ৪৫ বছর স্পেনে বসবাস করে সেখানকার নাগরিকত্ব পেলেও এখন তিনি দেশেই বেশি সময় কাটাচ্ছেন। বিশ্বজোড়া খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও তিনি পাড়ার চায়ের দোকানে কফি খেতে ভালোবাসেন, মসজিদে প্রার্থনা করেন এবং পথচারী বা হকারদের সঙ্গে অবলীলায় গল্প জুড়ে দেন। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, পরিবার, গ্যালারি বা বাজার শিল্পীকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও প্রকৃত শিল্প সবসময় শিল্পীর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। বিদেশে দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তিনি কখনো কোনো বৈষম্যের শিকার হননি এবং যেকোনো দেশকেই নিজের বাড়ির মতো আপন করে নিয়েছেন।
শিল্পের প্রতি এই অসামান্য নিবেদনের জন্য তিনি দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। স্পেন সরকার তাকে তাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘‘ক্রস অব অফিসার অব দ্য অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা’ (২০১০) এবং ‘কমান্ডার স্প্যানিশ অর্ডার অফ মেরিট’ (২০১৮) প্রদান করেছে। নিজ দেশ বাংলাদেশ তাকে ১৯৯৯ সালে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।