জিনোমের রহস্যভেদে অদম্য প্রাণ সেঁজুতি সাহা

বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞান ও গবেষণার জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ড. সেঁজুতি সাহা। চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা সিএইচআরএফ-এর এই নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞানী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পোলিও ট্রানজিশন ইনডিপেনডেন্ট মনিটরিং বোর্ডের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবেও কাজ করছেন। বিশেষ করে ২০২০ সালে বাংলাদেশে যখন করোনাভাইরাস বা সার্স-কোভ-২-এর প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন দেশের মাটিতে বসে এর জিনোম বা জীবনরহস্য উন্মোচনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

সেঁজুতি সাহার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা রাজধানী ঢাকাতেই। বিজ্ঞান যেন তার রক্তেই মিশে ছিল; কারণ তার বাবা ড. সমীর কুমার সাহা একজন প্রখ্যাত অণুজীব বিজ্ঞানী এবং মা ড. সেতারুন্নাহার সেতারা একজন জনস্বাস্থ্য গবেষক। বাংলাদেশে স্কুল ও কলেজের পাট চুকিয়ে তিনি পাড়ি জমান কানাডায়। সেখানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণরসায়ন বা বায়োকেমিস্ট্রিতে স্নাতক সম্পন্ন করার পর একই প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

টরন্টোর দ্য হসপিটাল ফর সিক চিলড্রেন-এ পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও, দেশের মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য তাগিদ তাকে ফিরিয়ে আনে শেকড়ের কাছে। কানাডায় গবেষণার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের সিএইচআরএফ-এ পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন এবং পরে ২০১৯ সালে সেখানে বিজ্ঞানী হিসেবে স্থায়ীভাবে যোগ দেন। তার সবচেয়ে যুগান্তকারী কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আনবায়াসড মেটাজিনোমিক সিকোয়েন্সিং নিয়ে গবেষণা, যার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে শিশুদের মেনিনজাইটিস এবং চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক প্রমাণ করেছিলেন।

কেন ড. সেঁজুতি সাহা বাংলাদেশের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিত্ব, তার উত্তর লুকিয়ে আছে তার কাজের দর্শন এবং অসামান্য অর্জনের তালিকায়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশে বসেও বিশ্বমানের জিনোমিক গবেষণা করা সম্ভব। বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যে তার এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৮ সালে অত্যন্ত সম্মানজনক বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস অ্যাওয়ার্ড এবং ২০২৩ সালে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পদক লাভ করেন। এছাড়া ২০২৩ সালে এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় (এশিয়ান সায়েন্টিস্ট ১০০) স্থান করে নিয়ে তিনি দেশের জন্য বিপুল গৌরব বয়ে আনেন। ড. সেঁজুতি সাহা কেবল একজন অসামান্য বিজ্ঞানীই নন, তিনি বাংলাদেশের অগণিত তরুণ ও নারীদের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস।