রঙের সিম্ফনির নিপুণ রূপকার মাহমুদুর রহমান দীপন

রঙ আর রেখার বুননে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জগতের এক নিপুণ রূপকার শিল্পী মাহমুদুর রহমান দীপন। ১৯৭০ সালে জন্মগ্রহণ করা এই গুণী শিল্পীর বেড়ে ওঠা মূলত রাজধানী ঢাকা শহরে। বাবার জুট মিলের চাকরির সুবাদে তার জীবনের কিছু সময় কেটেছে চট্টগ্রামের কালুরঘাট এবং ভৈরবে। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তার ছিল এক অদম্য টান। শৈশবের সেই ঝোঁক থেকেই ১৯৮৫ সালে এসএসসি পাসের পর তিনি চারুকলায় পা রাখেন। চারুকলার আঙিনাতেই তার ছবি আঁকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শক্ত ভিত্তি গড়ে ওঠে।

স্নাতকোত্তর পর্বে এসে দীপনের শিল্পভাবনায় এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। এ সময় তিনি নিরীক্ষাধর্মী কাজ শুরু করেন এবং প্রথাগত ফর্ম বা আকার ভাঙার খেলায় মেতে ওঠেন। এই নিরীক্ষা থেকেই বিমূর্ত ধারার প্রতি তার গভীর আকর্ষণ জন্ম নেয়। তার এই বিমূর্ত কাজের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে সংগীত। বিশেষ করে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক এবং জ্যাজ সংগীতের মূর্ছনা তার ক্যানভাসে অদ্ভুত এক জাদুর মতো কাজ করে। মিউজিশিয়ানরা যেমন গানের ভেতর দিয়ে ইম্প্রুভাইজ বা তাৎক্ষণিক সুরের বিস্তার করেন, দীপনও ঠিক একইভাবে রঙের তুলিতে ক্যানভাসে ইম্প্রুভাইজ করার চেষ্টা করেন। তিনি ছবির মাধ্যমে একটি সুর তৈরি করতে চান। কখনো কখনো সেই সুর কাক্সিক্ষত ছন্দে ধরা না দিয়ে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বা কেওস-এ পরিণত হয়। শিল্পীর জীবনদর্শনে, আমাদের সামগ্রিক জীবনটাই আসলে এমন এক বিশৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি।

কাজের মাধ্যমের ক্ষেত্রে এই শিল্পী দারুণ বৈচিত্র্যপ্রেমী। চারকোল, জলরং, প্যাস্টেল, অ্যাক্রিলিক এবং তেলরং সব মাধ্যমেই তার সমান বিচরণ রয়েছে। তিনি মনে করেন, প্রতিটি মাধ্যমের নিজস্ব একটি চাহিদা বা আবেদন থাকে, যার ফলে মাধ্যম বদলের সঙ্গে সঙ্গে ছবির বিষয়বস্তুতেও স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন আসে। কিছু স্যুরিয়াল বা পরাবাস্তব কাজের পাশাপাশি তিনি জ্যামিতিক এবং অর্গানিক ফর্মের সংমিশ্রণ ঘটিয়েও অসাধারণ সব চিত্রপট তৈরি করেন। তার কাজগুলো ভীষণভাবে মনস্তাত্ত্বিক। মানুষের ভেতরের আবেগ, অনুভূতি এবং বিশেষ কোনো মুহূর্তের গূঢ় মানসিক অবস্থাকে তিনি পরম মমতায় তুলির আঁচড়ে বন্দি করেন।

বাংলাদেশের বর্তমান আর্ট সিন বা শিল্পাঙ্গন নিয়ে শিল্পী দীপন বেশ ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। পাশাপাশি একাডেমিক শিক্ষার কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে তার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মূলত এক ধরনের অনুশীলনধর্মী কাজ শেখানো হয়। এই কাঠামোর বাইরে গিয়ে প্রতিটি শিল্পীর নিজস্ব চিন্তাভাবনাগুলো ক্যানভাসে বেরিয়ে আসা উচিত বলে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। একাডেমিক ধারার গণ্ডি পেরিয়ে নিজের মতো করে স্বাধীন পথ খুঁজে নেওয়াকে তিনি একজন শিল্পীর বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি মনে করেন। নিরলস কাজ করে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রেরণা তিনি নিজের ভেতর থেকেই পান। ক্যানভাসে রঙ নিয়ে মেতে থাকা তার কাছে কোনো ধরাবাঁধা কাজ মনে হয় না, এটি তার কাছে একান্তই এক আনন্দময় খেলার মতো।