খাদের কিনারে জ্বালানি খাত

অন্তর্বর্তী সরকারের এক চালে খাদে পড়েছে দেশের জ্বালানি খাত। ফলে স্বল্পমেয়াদি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন সরকার আন্তরিক হলেও কার্যকর কোনো কিছু করা সম্ভব হবে না। এতে করে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে দেশে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা পূরণ করা পেট্রোবাংলার জন্য দুরূহ হবে।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, এখন দেশে মোট গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ করা হয় দৈনিক ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এতে করে এখনই দেশে ঘাটতির পরিমাণ ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে এই পার্থক্য সত্ত্বেও রেশনিং করে মোটামুটিভাবে গ্যাস সংকট মোকাবিলা করা হয়। যদি এই ঘাটতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে দেশের বিদ্যুৎ এবং শিল্প উৎপাদনে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যা সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এতে দেশে তীব্র লোডশেডিং হওয়ার পাশাপাশি শিল্পের চাকা ঘুরবে না। এই সংকট যদি স্থায়ী রূপ নেয়, সেক্ষেত্রে দেশে বিনিয়োগ কমার পাশাপাশি রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

সংকট শুরু যখন থেকে : পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে দেশে এলএনজি সরবরাহ শুরু করা হয়। ওই সময় দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক সরবরাহ হতো ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বাইরে তখন একটি এলএনজি টার্মিনাল দিয়ে দৈনিক ৩০০ থেকে ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো। এরপর ক্রমান্বয়ে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় আরও একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হয়। দুটি টার্মিনাল দৈনিক ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারে। এখন দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় অবকাঠামো না থাকায় এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি করাও সম্ভব নয়।

সংকট কীভাবে আরও ঘনীভূত হচ্ছে : বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদন করে মার্কিন কোম্পানি শেভরনের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রটি এককভাবে দেশের সবচেয়ে বেশি গ্যাস উত্তোলন করে। পেট্রোবাংলার দৈনিক উৎপাদন প্রতিবেদনে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত এপ্রিল এবং মে মাসের উৎপাদনচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ক্ষেত্রটির গ্যাসের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমছে। গত ১ জানুয়ারি বিবিয়ানা জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করেছে ৮২৩ মিলিয়ন ঘনফুট; এর বিপরীতে গত ৩ মে বিবিয়ানা উৎপাদন করেছে ৭৯৪ মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, এই খনি থেকে যেভাবে গ্যাসের উৎপাদন কমছে, তা বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি ২০২৮ সালের শেষে কিংবা ২০২৯ সালের শুরুতে তাদের গ্যাসের উৎপাদন ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাবে। তখন বিবিয়ানার উৎপাদন নেমে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়াবে। একই সঙ্গে দেশের অন্য খনিগুলোর উৎপাদনও কমতে শুরু করেছে। দেশের মধ্যে নতুন যে কূপ খনন হচ্ছে, তা দিয়ে অন্য খনিগুলো থেকে উৎপাদনের ঘাটতি পূরণ হলেও বিবিয়ানার বিশাল ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। এখন সরকারের কাছে দুটি এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে, তা দিয়ে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি আমদানি করা যায়। নতুন করে টার্মিনাল নির্মাণ না করা হলে এলএনজি আমদানি বাড়ানো যাবে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করা কোনো সমস্যা নয়, কিন্তু সেটি ২০২৮ সালের মধ্যে গ্রিডে যোগ করা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়।

সংকট সমাধানে কী ছিল পরিকল্পনা

পেট্রোবাংলা আগে থেকেই দেশে জ্বালানি চাহিদা এবং সরবরাহের একটি পূর্বাভাস সরকারকে দিয়েছিল। সেই পূর্বাভাসে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। এর ভিত্তিতে সাবেক সরকার দেশে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং দেশীয় কোম্পানি সামিট এলএনজিকে আরও দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করে। প্রসঙ্গত, এখন দেশে যে দুটি এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে, সে দুটি টার্মিনালও এই দুই কোম্পানির। বিদ্যুৎ জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ বিধানে হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই প্রক্রিয়া বাতিল করে দেয়। এর মধ্যে সামিট এলএনজি টার্মিনালকে কার্যাদেশও দিয়েছিল সরকার। এক্সিলারেটকে কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টিও চূড়ান্ত ছিল। এই প্রক্রিয়া বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ওই সময় জি টু জি (সরকার থেকে সরকার) পর্যায়ে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য আগ্রহপত্র জমা নেওয়া হয়। সেই আগ্রহপত্রের ভিত্তিতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখা হয়। এই তালিকায় ১ নম্বরে নাম ছিল সৌদি অ্যারামকো। এরপর ২ নম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং ৩ নম্বরে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি)। তখন সরকার সৌদি অ্যারামকোকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতেও নিয়ে যায়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় নতুন সরকার এসে এ ধরনের চুক্তি টিকিয়ে রাখবে কি না এমন দ্বিধায় প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায় অ্যারামকো। সরকারকে ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এক্সিলারেট এনার্জিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়। কিন্তু তাদেরকে দাম কমিয়ে অ্যারামকোর নিচে নামানোর জন্য বলা হলেও তাতে রাজি হয়নি তারা। পরিস্থিতি বলছে, কেবলমাত্র এলএনজি আমদানি ছাড়া দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।

পেট্রোবাংলার হাতে বিকল্প কী রয়েছে

পেট্রোবাংলার হাতে ৩ বছরের মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো উৎস নেই। এখন একটি মাত্র খনিতে উদ্বৃত্ত গ্যাস রয়েছে। ভোলার এই খনিতে এখন উত্তোলনক্ষমতা রয়েছে ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট। এখানে মাত্র একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যারা দৈনিক সর্বোচ্চ ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করতে পারে। তবে বেশিরভাগ দিন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করে থাকে। সেই হিসাবে ভোলা থেকে দৈনিক চাইলে ১৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ভোলার সঙ্গে কোনো গ্যাস গ্রিডের সংযোগ নেই। বর্তমান সরকার ভোলা-বরিশাল-খুলনা ১৯৬ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই খনিতে এখন পর্যন্ত ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। ৯টি কূপেই গ্যাস পাওয়া গেছে। নতুন করে এখানে আরও ১০টি নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মূল সমস্যা হচ্ছে পাইপলাইন না থাকা। সরকার দ্রুত চাইলেও দরপত্র আহ্বান করে নানা প্রক্রিয়া শেষ করে এক বছরের মধ্যে পাইপলাইনের কাজ দিতে পারবে না। এ ছাড়া সরকার সাগরে যে গ্যাস অনুসন্ধান কাজ শুরুর কথা বলছে, অগভীর সমুদ্রে হলে এই অনুসন্ধান শেষে গ্যাস পেতে অন্তত ৬ বছর, অর্থাৎ ২০৩০ সালের আগে পাওয়া যাবে না। আর গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান কাজ শুরুর ১০ বছর পর, অর্থাৎ ২০৩৬ সালের আগে গ্যাস পাওয়া যাবে না। প্রসঙ্গত, ২০০৮ সাল থেকে দফায় দফায় দরপত্র আহ্বান করে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করতে চাইলেও কোনো সাফল্য এখনও পাওয়া যায়নি।

পেট্রোবাংলা কী চিন্তা করছে  জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) মো. আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংকট সৃষ্টি এবং এ জন্য কী করতে হবে, তা সরকারকে আমরা আগেই জানিয়েছি। নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, দেশীয় অনুসন্ধান এবং সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কী কী করতে হবে, সেই পরিকল্পনা আমরা সরকারকে দিয়েছি।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন : বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোর্তজা আহমেদ চিশতি বলেন, প্রতি বছর দেশীয় খনির গ্যাস ১৫০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমছে। এই পরিস্থিতিতে আমদানির জন্য অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আমদানির স্থায়ী উৎস ঠিক করার কোনো বিকল্প নেই। আমরা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে বলে আসছি, এ ধরনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এখনও তাই বলছি।

অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বক্তব্য :

আগের সরকারের এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প বাতিল করে দেওয়ায় এই সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশ। অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ভবিষ্যৎ সংকট বিবেচনা না করে প্রকল্প বাতিল করেছে বলে কেউ কেউ অভিযোগ করছেন এমন প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, আগের চুক্তিটি ছিল বিদ্যুৎ জ্বালানি বিশেষ বিধানে। আইনটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় চুক্তিটি বাতিল হয়ে গেছে। এ বিষয়ে আমরা ওই সময় আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়েছি; তারা বলেছে, এই চুক্তি বাতিলে কোনো আইনের ব্যত্যয় হবে না। অন্তর্বর্তী সরকার এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি বাতিল করে দুই বছরে কোনো টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তিও করতে পারেনি। এর ফলে দুই বছর সময় নষ্ট হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা জি টু জি ভিত্তিতে কয়েকটি কোম্পানির কাছ থেকে প্রস্তাব নিয়েছিলাম। এর মধ্যে সৌদি অ্যারামকো সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল। তাদের কাজ দেওয়ার জন্য আমরা সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায়ও প্রকল্পটি নিয়ে যাই। কিন্তু তত দিনে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় অ্যারামকো প্রকল্পটি আর করতে সম্মত হয়নি। তাদের বক্তব্য ছিল, নতুন সরকার এসে এই চুক্তি বাতিল করতে পারে। এরপর মার্কিন কোম্পানির তরফ থেকেও আমাদের কাজ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু তারা দাম কমাতে রাজি না হওয়ায় আমরা কাজ দিতে পারিনি। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে এই সংকট শুরু হবে, আমরা কেউ সেটা জানতাম না। তবে বাংলাদেশে নির্বাচনটি আরও বিলম্বিত হলে এই প্রকল্পের কাজ অ্যারামকো করত বলে মনে করেন তিনি।