পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের নেপথ্যে বাদ পড়া মুসলিম ভোটার!

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এ নির্বাচনে ২০৭টি আসন জিতেছে দলটি। অন্যদিকে মাত্র ৮০টি আসনে জয়লাভ করেছে রাজ্যটিতে দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস। 

ভারতীয় সংবাদ সংস্থা স্ক্রল ডটইন-এর বিশ্লেষণ বলছে, বিজেপির এমন জয়ের পেছনে রয়েছে ‘বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার এক চাঞ্চল্যকর প্রভাব। 

কলকাতার পাবলিক পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সবর ইনস্টিটিউট’-এর তথ্যের ভিত্তিতে করা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজেপি যেসব আসনে জয়লাভ করেছে, সেগুলোর মধ্যে ১০৫টি আসনেই দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি। এই ১০৫টি আসনের মধ্যে ৮৬টিই এমন আসন, যেখানে বিজেপি এর আগে কখনও জেতেনি।

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) কার্যক্রম চালানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এদের মধ্যে অন্তত ২৭ লাখ ভোটারের ভাগ্য এখনও বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।

এই এসআইআর কার্যক্রমে শুরু থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসসহ অন্য বড় দলগুলো আপত্তি জানিয়ে আসছিল। তবে বিজেপি এই সংশোধন প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিয়ে আসছিল। 

অনেকেই বলছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ছিল। দীর্ঘ ১৫ বছরের তার অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ একাট্টা হয়ে ভোট দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। যার ফলে গতবারের ২১৫ আসন থেকে তৃণমূল এবার ৮০ আসনে নেমে এসেছে।

যদিও বিশ্লেষণ বলছে, কেবল জনমত নয়, এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটারের নাম মুছে যাওয়াও তৃণমূলের পরাজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

উদাহরণ হিসেবে বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস আসনের কথা বলা হয়েছে। সেখানে গত ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও তৃণমূল নয় হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল। কিন্তু সংশোধনী প্রক্রিয়ায় সেখান থেকে ৭ হাজার ৫১৫ জন ভোটার বাদ পড়ার পর বিজেপি এবার মাত্র ৯০০ ভোটে আসনটি জিতে নিয়েছে।

দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর আসনেও একই চিত্র দেখা গেছে। এই আসনে ৫৬ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ে। আর এই আসনটিতে বিজেপি জিতেছে প্রায় ২৭ হাজার ভোটে। 

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ভবানীপুর আসনটি। এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছেন বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী এবং তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই আসনটিতে শেষ পর্যন্ত ৫ হাজার ১০৫ ভোটে জয়লাভ করেছেন শুভেন্দু। অথচ এই ভবানীপুর কেন্দ্র থেকেই ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ৫১ হাজারের বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।

একই দৃশ্য মমতার মন্ত্রিসভায় থাকা আরও অন্তত ১০ সদস্যের। টানা ২০ বছর টালিগঞ্জ আসনে জেতা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবার হেরেছেন ৬ হাজার ১৩ ভোটে। অথচ এই কেন্দ্রে নাম বাদ গেছে ৩৭ হাজার ৮৮৯ জন ভোটারের। শশী পাঁজা, সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী, মলয় ঘটক ও স্নেহাশীষ চক্রবর্তীর মতো প্রভাবশালী মন্ত্রীদের হারের ব্যবধানের চেয়ে তাদের কেন্দ্রে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নামের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া এই বিশাল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার থাকলে রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল অন্যরকম হতে পারত কি না, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে। 

এদিকে এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারদের প্রায় ৬৫ শতাংশই মুসলিম। অনেক বিশ্লেষকই বলছেন, বিজেপির জয়ের নেপথ্যে এই ৬৫ শতাংশ ভোটারের অনুপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কেননা, এদের অধিকাংশই আবার তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক বলে মনে করা হচ্ছে।