দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, মায়া ও মমত্ববোধের ওপর। ইসলামে অনেক বিষয় জায়েজ রাখা হয়েছে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায়, কিন্তু সেই জায়েজ কাজগুলো সবসময় সব পরিবেশে মানবিক বা প্রশংসনীয় নয়। সম্প্রতি এক ইসলামি বক্তার দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তার স্ত্রী যখন সন্তান প্রসবের যন্ত্রণায় কাতর এবং মাত্রই একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তার দ্বিতীয় বিয়ের সংবাদ অনেককেই হতবাক করেছে। ইসলামের মূল স্পৃহা ও মানবিক বোধের নিরিখে বিষয়টি নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ জরুরি। বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ ‘আল-বাহরুর রায়েক’-এ একটি অসাধারণ কথা বলা হয়েছে, ‘বর্তমান স্ত্রীর মন না ভাঙতে একাধিক বিয়ে থেকে বিরত থাকা সাওয়াবের কাজ।’ বস্তুত একেই বলে ফাকাহাত বা দ্বীনের গভীর বুঝ। ইসলামে বহুবিবাহ জায়েজ হলেও তা শর্তহীন নয় এবং একে উৎসাহিত করা হয়নি। বিশেষ করে স্বাভাবিক অবস্থায় এটি অনুত্তম কাজ। বর্তমান সমাজে আমরা ধর্মের দোহাই দিয়ে বহুবিবাহের নামে যা দেখছি, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রই দ্বীনের নামে এক ধরনের তামাশার নামান্তর। যখন একজন পুরুষ তার স্ত্রীর মানসিক অবস্থা বা কষ্টের তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছাকে ‘সুন্নাহ’ বা ‘গুনাহ থেকে বাঁচার উপায়’ হিসেবে উপস্থাপন করেন, তখন ধর্মের মূল চেতনাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
মাওলানা আবদুল্লাহ আল মাসুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের এক পোস্টে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘আমার ছেলের যখন জন্ম হয়, আমি তার মায়ের পাশে ছিলাম। নরমাল ডেলিভারি হয়েছিল। ফলে প্রসবের আগে তাকে প্রচুর কষ্ট আর যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। সেটা দেখে আমার ভেতরটা ভেঙে চৌচির হয়ে গিয়েছিল। কখনো কখনো চোখে পানিও চলে এসেছিল। সেই সময় আমার দুটো অনুভূতি হয়েছিল। প্রথমটি হলো, অন্তত এই কষ্টভোগের কারণে হলেও আগামী দিনগুলোতে তার সব ত্রুটি ইগনোর করা উচিত। কখনো কোনো কিছু নিয়ে রাগ করা ঠিক হবে না। কারণ এই প্রচণ্ড ব্যথা-বেদনা আর কষ্টের সামনে তার ভুলত্রুটি কিছুই না আসলে। দ্বিতীয়টা হলো, প্রত্যেক বাবারই উচিত সম্ভব হলে সন্তান জন্মের সময়টাতে স্ত্রীর পাশে থাকা। তার কষ্টগুলো অনুভব করা। এটা পরবর্তী জীবনে অন্যরকম বোধের জন্ম দেবে। যাই হোক, সম্প্রতি এক ইসলামি বক্তা স্ত্রীর সন্তান প্রসবের আগে আগে দ্বিতীয় বিয়ে করতে চলে যাওয়ার ঘটনাটি সামনে আসার পর বারবার শুধু আমার ছেলের জন্ম-সময়ের স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে। একজন মা আসলে একসঙ্গে ঠিক কতগুলো কষ্ট সইবার ক্ষমতা রাখেন? উল্লেখ্য, যেদিন কারও বাবা মারা যায়, সেদিন তাকে দাফন করে এসে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করে বারবিকিউ পার্টি করা শরিয়তে নিষেধ নয়। এটা তাদের জন্য বললাম, যারা শরিয়তের জায়েজ-নাজায়েজের বাইরে আরও কিছু বিষয় যে লক্ষণীয় থাকে সেটা মানতে নারাজ।’
ওই ইসলামি বক্তা নিজের পক্ষ সমর্থন করে বলেছেন, তিনি গুনাহ বা ব্যভিচার থেকে বাঁচতে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তবে প্রশ্ন হলো, একজন সচেতন মুসলিম কি কেবল শারীরিক চাহিদা মেটানোয় সীমাবদ্ধ থাকবেন? ইসলামের নৈতিক শিক্ষা কি তাকে ধৈর্য এবং স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা শেখায় না? যে স্ত্রী তার জন্য মৃত্যুযন্ত্রণা সহ্য করে একটি সন্তান জন্ম দিলেন, সেই স্ত্রীর সবচেয়ে কষ্টের সময়ে তাকে সঙ্গ না দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা কি কোনোভাবেই মানবিক হতে পারে? একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মীয় গভীরতা মাপা হয় তার সহমর্মিতা দিয়ে। যখন কোনো কাজ মানুষের মনে কষ্টের উদ্রেক করে এবং পারিবারিক শান্তি বিঘিœত করে, তখন তাকে আর পুণ্যের কাজ বলার সুযোগ থাকে না। ওই ইসলামি বক্তার এই কাজটির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মানুষ মনে করতে পারে, ইসলাম হয়তো নারীদের আবেগের কোনো মূল্যায়ন করে না, যা সম্পূর্ণ ভুল।
ইসলামে দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি রাখা হয়েছে ‘মাওয়াদ্দাহ’ ও ‘রাহমাহ’ তথা ভালোবাসা ও দয়ার ওপর। একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো তিনি অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হবেন। নিজের ক্ষুদ্র লালসা পূরণ করতে গিয়ে অন্য একজনকে আজীবনের জন্য কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া মুমিনের কাজ হতে পারে না। মাওলানা আবদুল্লাহ আল মাসুদ যেমনটি বলেছেন, স্ত্রীর প্রসবকালের কষ্ট অনুভব করতে পারলে একজন স্বামী কখনো তার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করবেন না। কিন্তু ওই ইসলামি বক্তার ক্ষেত্রে দেখা গেল, তিনি স্ত্রীর সেই কষ্টের সময় তার পাশে না থেকে নিজের জৈবিক চাহিদা মেটানোর পথ খুঁজে নিয়েছেন। এটি কেবল তার মানসিক সংকীর্ণতা নয়, বরং ইসলামের মূল প্রাণশক্তি থেকে বিচ্যুত হওয়ার বহিঃপ্রকাশ।
ইসলামের প্রতিটি বিধানের পেছনে একটি উদ্দেশ্য এবং সৌন্দর্য থাকে। যখন আমরা কেবল আইনের বাহ্যিক দিকটি দেখি এবং এর অন্তর্নিহিত করুণা বা দয়াকে অবহেলা করি, তখন আমরা ভুল পথে পরিচালিত হই। ইসলামি বক্তা যা করেছেন তা নাজায়েজ কাজ নয় ঠিকই, কিন্তু তা চরম অমানবিক ও নিন্দনীয়। সব জায়েজ কাজ প্রশংসনীয় নয়, এই সত্যটি আমাদের অনুধাবন করতে হবে। দ্বীন পালন মানে কেবল বিয়ের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের অধিকার রক্ষা করা এবং বিশেষ করে স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ ও মমতাবান হওয়া। যে ঘরে মমতা নেই, সেখানে যতই ইবাদত হোক না কেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা কঠিন।
আমাদের উচিত ইসলামের মূল চেতনাকে ধারণ করে মানবিক ও রুচিবান হওয়ার চেষ্টা করা। স্ত্রীর প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শনই হলো একজন আদর্শ মুসলিমের পরিচয়। নফসের দাসত্ব ত্যাগ করে মানুষের প্রতি বিশেষ করে জীবনসঙ্গিনীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করাই হলো প্রকৃত ফাকাহাত বা দ্বীনের বুঝ। এই কর্মকাণ্ডকে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রশংসার কোনো সুযোগ নেই, বরং এটি একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে, কীভাবে একটি জায়েজ কাজও অমানবিক হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক
muftimahbub503@gmail.com