অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যাংকিং খাত, দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের শিল্পায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে খাতটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই খাতের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ক্রমে জটিল হয়ে উঠছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, বৈশি^ক প্রতিযোগিতা, আর্থিক খাতে অনিয়ম এবং সুশাসনের ঘাটতি এসব বিষয় ব্যাংকিং খাতকে, নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এমন প্রেক্ষাপটে দক্ষ, আধুনিক এবং নৈতিক মানবসম্পদ গড়ে তোলার গুরুত্ব অপরিসীম। এই খাতে সরাসরি কাজ করছে শত শত কর্মকর্তা ও কর্মচারী। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সমাজের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ফলে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকিং খাত কাজ করছে নিরলসভাবে। সুতরাং, এই খাতের কর্মকর্তাদের আরও আধুনিক করতে দরকার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণের জন্য সবার আগে দরকার কিছু নীতিমালা। যদিও প্রতিটি ব্যাংকের নিজস্ব প্রশিক্ষণ নীতিমালা রয়েছে। তবু বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনা প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য হবে মাইল ফলক। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নবনিযুক্ত তফসিলি ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য ফাউন্ডেশন ট্রেনিং সংক্রান্ত নির্দেশিকা গত ৭ মে ২০২৬ তারিখে জারি করা হয়। এটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রশিক্ষণের মান ও কাঠামোর মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল। কোথাও প্রশিক্ষণ ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও ফলপ্রসূ আবার কোথাও ছিল আনুষ্ঠানিকতা নির্ভর। ফলে নতুন কর্মকর্তাদের দক্ষতায় বৈষম্য তৈরি হতো, যা ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক কর্মদক্ষতাকে প্রভাবিত করত। ফাউন্ডেশন ট্রেনিং সংক্রান্ত নির্দেশিকার মাধ্যমে একটি অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
নির্দেশিকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এর কাঠামোগত ভারসাম্য। একদিকে এটি বাধ্যতামূলক, অন্যদিকে নমনীয়। অর্থাৎ সব ব্যাংকের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কাঠামো নির্ধারণ করা হলেও, ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। এই পদ্ধতি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করে, যা কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষণের মেয়াদ ১৪ সপ্তাহ নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মধ্যে ৮ সপ্তাহ তাত্ত্বিক এবং ৬ সপ্তাহ ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। এই সময়সীমা একজন নতুন কর্মকর্তার জন্য একটি প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে তুলতে যথেষ্ট হতে পারে। তাত্ত্বিক জ্ঞানের মাধ্যমে ব্যাংকিংয়ের মৌলিক ধারণা অর্জিত হয় আর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেই জ্ঞান বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগের দক্ষতা তৈরি হয়। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ যথাযথভাবে পরিচালিত হয় না। প্রশিক্ষণার্থীরা শাখায় সংযুক্ত থাকলেও, তাদের হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ সীমিত। এই সীমাবদ্ধতা দূর করা না গেলে, প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য আংশিকভাবে অপূর্ণ থেকে যাবে। তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু বিস্তৃত ও যুগোপযোগী। এতে সামষ্টিক অর্থনীতি, মুদ্রানীতি, ব্যাংকিং আইন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, হিসাববিজ্ঞান, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারের কারণে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক জ্ঞানের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন এবং ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেম ব্যাংকিং কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে নতুন ব্যাংক কর্মকর্তাদের এই বিষয়ে দক্ষ করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। যদি প্রশিক্ষণ কেবল লেকচারভিত্তিক হয় এবং অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির অভাব থাকে, তাহলে শেখার কার্যকারিতা কমে যায়। নির্দেশিকায় কেস স্টাডি, গ্রুপ ডিসকাশন এবং সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষার কথা বলা হলেও, বাস্তবে এগুলোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রশিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ কৌশল প্রয়োগ অপরিহার্য। আইনগত জ্ঞানের ওপর গুরুত্বারোপ নির্দেশিকার একটি শক্তিশালী দিক। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সম্পর্কে জ্ঞান ব্যাংকারদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, আইনগত ও নৈতিক সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু আইন জানলেই হবে না; তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করার মানসিকতা ও নৈতিকতা গড়ে তোলাও জরুরি। সফট স্কিল উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া নির্দেশিকার আরেকটি ইতিবাচক দিক। ব্যাংকিং খাতে গ্রাহকসেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একজন ব্যাংকারকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করতে হয়। তাই যোগাযোগ দক্ষতা, ধৈর্য, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং দলগত কাজের দক্ষতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বাস্তবে এই বিষয়গুলো অনেক সময় অবহেলিত থাকে। ফলে প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, তা কার্যকরভাবে গড়ে ওঠে না। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য। ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে এসএমই ও কৃষি খাত পরিদর্শনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ব্যাংকারদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা প্রদান করতে পারে।
প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, সিমুলেশন সফটওয়্যার এবং ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করলে শেখার অভিজ্ঞতা আরও উন্নত হতে পারে। বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং প্রশিক্ষণে এসব আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। নির্দেশিকায় মূল্যায়ন এবং প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষতা যাচাই করা সম্ভব হবে এবং প্রশিক্ষণ পদ্ধতির দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা যাবে। তবে মূল্যায়ন যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে এর কার্যকারিতা কমে যাবে। এই নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতাবলে জারি করা হয়েছে। ফলে এটি সব তফসিলি ব্যাংকের জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নিয়ম থাকলেই তা কার্যকর হয় না সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রয়োজন কঠোর তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে প্রশিক্ষণকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখার মানসিকতা নেই বললেই চলে। এই খাতকে অনেকেই খরচের খাত হিসেবেই দেখেন। কিন্তু এই খাত হিউম্যান ক্যাপিটালে গঠনেও ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন ব্যাংকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, প্রশিক্ষণকে আরও আধুনিক ও আকর্ষণীয় করতে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় কঠিন ও কর্মোপযোগী তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না। সবশেষে বলা যায়, এই নির্দেশিকা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি একটি সুসংগঠিত এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ কাঠামো প্রদান করে, যা নতুন ব্যাংকারদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। যদি এটি শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে থেকে যায়, তাহলে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাবে না। কিন্তু যদি আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে এটি ব্যাংকিং খাতকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ এবং আধুনিক করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, এ জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। এই নির্দেশিকা সেই লক্ষ্যে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, এটি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়। এই নির্দেশিকার সফল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রশিক্ষণকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে না দেখে বরং একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট, সময় এবং মানবসম্পদ বরাদ্দে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানবসম্পদ উন্নয়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত সক্ষমতা। অনেক ব্যাংকের নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকলেও সেখানে আধুনিক প্রযুক্তি, সিমুলেশন ল্যাব, ডিজিটাল লার্নিং টুল বা বাস্তবভিত্তিক ব্যাংকিং পরিবেশ (মক ব্রাঞ্চ) পর্যাপ্তভাবে বিদ্যমান নেই। ফলে প্রশিক্ষণ অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে। এই ঘাটতি দূর করতে হলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু নবনিযুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য নয়, বরং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের জন্যও নিয়মিত রিফ্রেশার কোর্স, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর আপডেটেড শেখার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এই নির্দেশিকা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা ও লেখক
liplisa7@gmail.com