বাংলা সিনেমায় লোকজ সংস্কৃতি, মিথ ও মানবিক আবেগকে এক অনন্য নান্দনিকতায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন ইতিমধ্যেই নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। তার প্রথম চলচ্চিত্র হাওয়া দেশীয় সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপক প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। লোককথা, মিথ এবং সমকালীন বাস্তবতার মিশেলে নির্মিত সেই চলচ্চিত্রটি যেমন দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়, তেমনি এর গানগুলোও আজও সমানভাবে আলোচিত ও সমাদৃত।
সেই ধারাবাহিকতায় আসন্ন ঈদুল আজহায় মুক্তির অপেক্ষায় থাকা নতুন চলচ্চিত্র রইদ ইতিমধ্যেই দর্শকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। কিছুদিন আগে প্রকাশিত প্রথম গান ‘রইদ আইলা গা জুড়াইতে’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বস্তরের দর্শকের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সেই আবহের মধ্যেই গতকাল সন্ধ্যায় মুক্তি পেয়েছে চলচ্চিত্রটির দ্বিতীয় গান ‘মন ছাড়া কি মনের মানুষ রয়’।
গানটির মুক্তির ঘোষণা আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দর্শক ও শ্রোতাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উল্লেখযোগ্য উন্মাদনা। কারণ, এটি শুধুমাত্র একটি গান নয়, বরং বাংলার আধ্যাত্মিক লোকসংগীতের ঐতিহ্য, বাউল দর্শন এবং গভীর মানবিক অনুভূতির এক আবেগঘন বহিঃপ্রকাশ। এই গানের রচয়িতা শ্রীমৎ মাতান চাঁদ গোস্বামী (গোসাই) বাংলার লোকসংগীত ধারার এক প্রখ্যাত বাউল সাধক ও মহাজনী পদাবলির রচয়িতা।
তার আধ্যাত্মিক দর্শনে ভরপুর গানগুলো বাংলা লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের তারাপীঠের কিংবদন্তি দৃষ্টিহীন বাউল সাধক ও শিল্পী কানাই দাস বাউল।
তার কণ্ঠের মায়া, গভীরতা এবং আধ্যাত্মিক আবেগ এই গানটিকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। শ্রোতার কাছে গানটি হয়ে উঠেছে এক নিঃশব্দ হাহাকার, এক অন্তর্গত অনুভূতির যাত্রা।
রইদ চলচ্চিত্রে গানটির নতুন সংগীতায়োজন করেছেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য সংগীত পরিচালক ইমন চৌধুরী। দেশীয় লোকবাদ্যের আবহের সঙ্গে আধুনিক ওয়েস্টার্ন ট্র্যাকের সংমিশ্রণে তিনি গানটিকে দিয়েছেন এক সমকালীন অথচ শেকড়-নির্ভর আবহ।
গানটি প্রসঙ্গে ইমন চৌধুরী বলেন, মেজবাউর রহমান সুমন ভাইয়ের মতো একজন ফাইনেস্ট ডিরেক্টরের সঙ্গে কাজ করা সবসময়ই আমার জন্য সৌভাগ্যের। এর আগেও আমরা একসঙ্গে অনেক অসাধারণ কাজ করেছি। তবে এই প্রজেক্টটি আমার জন্য আরও স্পেশাল, কারণ সদ্যপ্রয়াত সাধক ও শিল্পী কানাই দাস বাউলের সঙ্গে আমরা একটি নতুন গান করতে পেরেছি। শুরু থেকেই এই গানটির প্রতি আমাদের এক অন্যরকম অনুভূতি ছিল। গানটিতে এক ধরনের হাহাকার আছে, আছে নীরবতার গভীরতা। আমি এবং আমার পুরো মিউজিক টিম চেষ্টা করেছি যেন দেশীয় সংগীতের আবেগের সঙ্গে আধুনিক সাউন্ডের একটি ইমোশনাল ফিউশন তৈরি হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে গানটিতে একটি ‘ইনফিনিট ফিল’ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
গানটি নিয়ে চলচ্চিত্রটির পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, মাতান চাঁদ গোসাইয়ের ‘মন ছাড়া কি মনের মানুষ রয়’ গানটি আমি বহু বছর ধরে শুনে আসছি। গানটি আমার অত্যন্ত প্রিয় এবং আমি সবসময় এটি কানাই দাস বাউলের কণ্ঠেই শুনেছি।
যখন ‘রইদ’-এর চিত্রনাট্য লিখছিলাম এবং সিনেমাটির ডেভেলপমেন্ট চলছিল, তখন এই গানটি আমি বারবার শুনতাম। কানাই দাস বাউল অসাধারণ মায়ামাখা কণ্ঠে গানটি গাইতেন। ‘রইদ’-এর জন্য গানটির সংগীতায়োজন করেছেন ইমন চৌধুরী। খুব দুঃখের বিষয়, গানটি কানাই দাস বাউলের মৃত্যুর পর প্রকাশ পাচ্ছে। সত্যি বলতে, তাকে যদি এই গানটি শুনাতে পারতাম, খুব ভালো লাগত। কিন্তু তিনি শুনে যেতে পারলেন না। তবে তার সেই মায়ামাখা কণ্ঠ আমাদের সিনেমার মধ্য দিয়ে থেকে যাবে। বাংলার লোকজ আত্মা, বাউল দর্শনের গভীরতা এবং সমকালীন সংগীত নির্মাণের মেলবন্ধনে ‘মন ছাড়া কি মনের মানুষ রয়’ ইতিমধ্যেই হয়ে উঠেছে রইদ চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত অনুষঙ্গ। দর্শক-শ্রোতাদের জন্য গানটি আজ সন্ধ্যায় সব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত হবে।