পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত সবাই তাদের জুনিয়রকে ‘ম্যানেজ’ করে নেওয়ার নির্দেশ দেন। অধিকাংশ পুলিশ সদস্য ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ম্যানেজ করার কৌশল শেখানোর ফলে পরিচ্ছন্ন ও দুর্নীতিমুক্ত পুলিশি সেবা পাওয়া এখনো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাগ যত কঠোরই হোক এতে তেমন লাভ হবে না। কেউ পরিবার-পরিজন রেখে ম্যানেজ কৌশলে আয়ের অনেকটাই খরচ করবে, এটা হয় না। মামলা রেকর্ড হওয়ার পর থেকে অপরাধী গ্রেপ্তারে অপারেশন পরিচালনা এবং মামলার তদন্ত পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজের পকেট থেকে ম্যানেজ (খরচ) করতে নির্দেশ দেন।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, একজন পুলিশ সদস্য প্রশিক্ষণ শেষ করে কর্মজীবনের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই এই ‘ম্যানেজ কৌশল’ রপ্ত করেন। এর পেছনে বড় ভূমিকা তার ঊর্ধ্বতনের। অনেক সময় দেখা গেছে, অফিসের প্রয়োজনে বের হওয়ার সময় ফান্ড পাচ্ছেন না। তার সিনিয়র বিষয়টি ম্যানেজ করে নিতে বলছেন। মন খারাপ হলেও একপর্যায় গিয়ে ওই নবীন পুলিশ কর্মকর্তা ম্যানেজ করার কৌশল শিখে যাচ্ছেন। এভাবে কমিশনার ডিসিকে, ডিসি ওসিকে আর ওসি তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিচ্ছেন। সিনিয়রের নির্দেশে পকেটের টাকা খরচ করে আর সে টাকা পাননি তদন্ত কর্মকর্তা এমন হাজারো উদাহরণ পুলিশে আছে। দুর্নীতিমুক্ত পুলিশিংয়ে বড় বাধা এ ম্যানেজ কৌশল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কয়েকটি থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্ত ব্যয় বিল দেওয়া হয় খুবই নগণ্য। এর মধ্যে এক বছরের বেশি সময় ডিএমপির থানাগুলোতে কোনো তদন্ত ব্যয় বিলের বরাদ্দ ঠিকমতো পাচ্ছে না। এসব কারণে মানসিকসহ বিভিন্ন চাপে থাকছে সদস্যরা। আবার অনেক থানায় তদন্ত ব্যয় বিল নিয়িমিত দেওয়া হয়। যেখানে ব্যয় বিলের ফান্ড স্থায়ীভাবে থানায় থাকার কথা, সেখানে অনেক থানা সেটা পাচ্ছে না।
কোন মামলার তদন্ত বিল কত : খুন ও ডাকাতি মামলায় ৬ হাজার, অপহরণ ও মানব পাচার মামলায় ৫ হাজার, দস্যুতা ও অপমৃত্যু মামলায় (লাশ ব্যবস্থাপনা) ৪ হাজার; এসিড নিক্ষেপ, দ্রুত বিচার আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, অস্ত্র ও বিস্ফোরক মামলা, অর্থ পাচার মামলায় ৩ হাজার টাকা বরাদ্দ। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক মামলাসহ অন্যান্য মামলায় ২ হাজার টাকা তদন্ত ব্যয় বিল বরাদ্দ রয়েছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর থানায় রুজুকৃত মামলার তদন্ত ব্যয় বিল পুনর্নির্ধারণ করে একটি আদেশ জারি করে সরকার।
ওই চিঠিতে বলা হয়, থানার ওসির কাছে স্থায়ী অগ্রিম ব্যয় বিল জমা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডিএমপির থানায় এক লাখ, অন্য মেট্রো ও জেলা সদর থানায় ৮০ হাজার, জেলার সদর ব্যতীত অন্য থানায় ৩০ হাজার, রেলওয়ে থানায় ২০ হাজার, পার্বত্য থানায় ১০ হাজার ও পুলিশের তদন্তকারী ইউনিটগুলোতে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম জমা থাকবে। ওই অর্থ থেকে কোনো কর্মকর্তাকে মামলার তদন্তভার দেওয়ার সঙ্গে ব্যয় বিলের ৫০ শতাংশ অর্থ প্রদান করতে হবে। এরপর মামলার চার্জশিট বা চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিলের পর বাকি অর্থ প্রদান করতে হবে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ তদন্ত ব্যয় বিলে আবার শুভংকরের ফাঁকিও আছে। একটা মামলা যদি এক-দুই বা তার অধিক কর্মকর্তা তদন্ত করেন, তবে শুধু প্রথম ও সর্বশেষ কর্মকর্তা তদন্ত বিল অর্ধেক করে পান। মাঝখানে যত তদন্ত কর্মকর্তা থাক তারা কিছুই পান না, তারা যেটা ব্যয় করবেন, সেটা ম্যানেজ কৌশলে থেকে। এ কৌশলের পুরো চাপটা পুলিশি সেবাপ্রত্যাশীদের ওপরে পড়ে বলেও স্বীকার করেন তিনি। পুলিশের যেই পদমর্যাদার কর্মকর্তাই তদন্ত কাজে নিয়োজিত হন, তাকেই এই ম্যানেজ কৌশলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তিনি বলেন, এদিকে কোর্টে রেকর্ড হওয়া মামলা, থানায় হওয়া জিডি ও অভিযোগ তদন্তে কোনো বিলও দেওয়া হয় না। পুলিশ কি নিজের বেতনের টাকা দিয়ে সব কিছু করবে? তারও তো পরিবার আছে। এ ম্যানেজ কৌশলই পুলিশকে জনতার পুলিশ হতে দিচ্ছে না।
গণধর্ষণ মামলাসহ কিছু সিডিউলভুক্ত মামলা পরিদর্শক থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তদন্ত করেন। এসব মামলায় এসআইদের সাধারণত তদন্ত দেওয়া হয় না। ধর্ষণ, অস্ত্র, হত্যা ও এসিড নিক্ষেপসহ বেশ কিছু মামলার ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত কর্মকর্তাকে টেকনিক্যাল সাপোর্ট (কল ডিটেইল রেকর্ড-সিডিআর) দেন। কিন্তু তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ মামলার ক্ষেত্রে টাকা খরচ করে পুলিশের মধ্য থেকেই সিডিআর নিতে হয় তদন্ত কর্মকর্তার। অথচ পুলিশে সিংহভাগ মামলা তদন্ত করেন এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তারা।
গদবাঁধা ভাউচারে তুলছে তদন্ত বিল : তথ্য সংগ্রহ, কোর্ট পরিবহন, মামলার নথিপত্র তৈরি, কাগজ, কলম ও কার্বন ক্রয়ে ব্যয় দেখানো হয়। এ একটি নির্দিষ্ট ফরমেটে তদন্ত শেষে ভাউচার জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তারা। এতে প্রকৃত তদন্ত ব্যয় উঠে আসে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান তথ্য : চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) সারা দেশে থানাগুলোতে ৫৯ হাজার ১৭০টি মামলা রেকর্ড করা হয়। দৈনিক রেকর্ড হয় ৪৯৩টি মামলা। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৪ হাজার ৫৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ১১ হাজার ৭৭৫টি, মার্চে ১৬ হাজার ১৫৭টি ও এপ্রিলে ১৭ হাজার ১৮০টি। এসব মামলার মধ্যে ১৮৪টি ডাকাতি, ৫৯১টি ছিনতাই, ১ হাজার ১৪২টি খুন, ২৭৩টি দ্রুত বিচার আইন, ৫টি দাঙ্গা, ৫ হাজার ৯৫৮টি নারী-শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ, ৩৪৭টি অপহরণ, ২১৩টি পুলিশের ওপর হামলা, ৪ হাজার ৯৯টি চুরি, ৭৩৬টি অস্ত্র, ৯৩টি বিস্ফোরণ, ১৯ হাজার ৪৯টি মাদকদ্রব্য আইন, ৭২৮টি চোরাচালান ও ২৫ হাজার ৭৫২টি অন্যান্য মামলা রেকর্ড করা হয়। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, ডিএমপি ও বরিশাল রেঞ্জে মামলা হয়েছে।
ম্যানেজ কৌশলে ক্লান্ত পুলিশ সদস্যদের কথা : ঢাকায় পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিটে এসআই পদে কর্মরত সিয়াম খন্দকার (ছদ্মনাম) নামে এক কর্মকর্তা শোনালেন তার ম্যানেজ কৌশলের গল্প। তিনি এসআই পদে দীর্ঘ ১২-১৪ বছর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কাজ করেছেন। কয়েক বছর আগে বর্তমান ইউনিটে বদলি করা হয়। এরপর নতুন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন সিয়াম। দুই সন্তানসহ পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন। সন্তানদের পড়ালেখা ও পরিবারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।
সিয়ামের সব মিলিয়ে বেতন-ভাতা ৬০-৬২ হাজার টাকা। সেখান থেকে আয়কর, ভবিষ্য তহবিল ও ব্যাংক লোন প্রভৃতি কেটে রাখার পর হাতে থাকে হাজার ৪৫ টাকা। এদিকে টিএ বিল পেতেন ১২ হাজার টাকা, তাও গত মার্চ থেকে কমিয়ে ৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। সেটিও চার ধরে মাস বকেয়া।
এবার আসা যাক তার ম্যানেজ কৌশলের বিষয়ে ঢাকার মতিঝিল থানার একটি মামলা ২০২৩ সাল থেকে তদন্ত করছেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। তদন্ত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন পর্যন্ত ওই মামলার কাজে তার নয়বার মহানগর দায়রা জজকোর্টে যেতে হয়েছে পিটিশন দাখিলের জন্য। প্রতিবারেই কোর্টের স্টেনোকে ৫০০-১,০০০ টাকা দিতে হয়েছে। এরপর মামলায় জব্দকৃত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের জন্য ১০-১২ বার কোর্টে ১-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। এ সময়ে কোর্ট তলব করেছে ১০-১৫ বার। প্রতিবারই নিজের পকেটের টাকায় যাতায়াত করতে হয়েছে। এ ছাড়া মামলার তদন্তে ঢাকার উত্তরা ও মিরপুরসহ ২৫-৩০ বার অফিস ভিজিট করতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় ঝামেলায় হলো বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি সংরক্ষণের কাজে প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ইউনিট থেকে ভাউচারে সে অর্থ দেওয়ার কথা থাকলেও পরে দেয়নি। ওই সময় একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ম্যানেজ করে নিতে বলেছিলেন।
সিয়ামের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত কাজে সরকারি কোনো দপ্তর অর্থ ছাড়া পুলিশকে সহযোগিতা করে না। এমনকি নিজের বাহিনীর মধ্যে থেকেও কোনো আসামির সিডিআর সংগ্রহ করতে হলে অর্থ খরচ করতে হয়। সাধারণত হত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা ও অপমৃত্যুর মামলার ক্ষেত্রে বড় ধাক্কা খেতে হয় ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও আয়কর নথি সংগ্রহে। সেখানে ফটোকপি ও স্পিডমানির নামে চলে অর্থ তছরুপ। একমাত্র ব্যাংক কোনো অর্থ ছাড়াই পুলিশকে তথ্য সরবরাহ করে। শুধু পুলিশ কর্মকর্তা সিয়ামই নন তার মতো সব তদন্ত কর্মকর্তাকেই মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে ম্যানেজ কৌশল কাজে লাগাতে হয়।
সিয়াম জানান, পুলিশে ৮০ শতাংশ সদস্য মামলার কাজে কেউ আর্থিক সহযোগিতা করতে চাইলে না করে না। ১৫ শতাংশ সদস্যকে কোনো কিছুতেই টলানো যাবে না। আর ৫ শতাংশ সদস্য টাকার জন্য সাধারণের ওপর জোর-জবরদস্তি করেন। এটা আংশিক সত্য বলে দাবি একজন বিশেষজ্ঞের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত অধিকাংশ লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করতে বাধ্য হন পরিবারের সদস্যরা। ওই ঘটনার একটি লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্ত কাজে ব্যয় করা টাকার হিসাবের কপি দেশ রূপান্তরের হাতে আসছে। সেখানে দেখা গেছে, একটি মামলা তদন্তের স্বার্থে লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের আদেশ দেয় আদালত। ওই কাজে ঢাকা থেকে জেলা সদর পর্যন্ত (দূরত্ব ৮৬ কিলোমিটার) তিন সদস্যের একটি দল যায়। এতে ছিলেন একজন এসআই, একজন এএসআই ও একজন কনস্টেবল। এরপর জেলা সদর থেকে কবরস্থানে যাওয়া-আসা ভাড়া, লাশ উত্তোলনের জন্য কেরোসিন, পলিথিন, কবর খোঁড়ায় ছয়জন কর্মীর পারিশ্রমিক এবং লাশ কবরস্থান থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া-আসায় মোট ১৭ হাজার টাকা খরচ হয়। এ ছাড়া জেলা শহরে রাতযাপন ও খাওয়ার খরচ হিসাবের বাইরে।
সরকার পরিবর্তনের পর মামলার তদন্ত কার্যক্রমের স্বার্থে আদালতের নির্দেশে অনেক লাশ আবার কবর থেকে তুলতে হয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সংস্থার। এতে পুরো ব্যয়ভার বহন করতে হয়েছে তদন্ত কর্মকর্তার। এখন পর্যন্ত সে টাকা পাননি তারা। প্রথমবার ‘লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্ত ব্যয়’ ভাউচার জমা দিলেও কাজ হয়নি। এর মধ্যে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খরচের হিসাব চাওয়া হয়। সে তথ্য দিয়েও এখনো ম্যানেজ খরচ পাওয়া যায়নি।
ডিএমপির একটি থানায় এসআই পদে কর্মরত আরেক পুলিশ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলা তদন্ত থেকে শুরু করে আভিযানিক কাজে সরকারের বরাদ্দ কম। সোর্স মানিসহ বিভিন্নভাবেই ম্যানেজ করে চলতে হয়। স্যাররা শুধু বলেন, এখন ম্যানেজ করে নেন, পরে দেখছি। কিন্তু পরে আর দেখেন না! এভাবে প্রতিটা মামলায় ম্যানেজ করতে হচ্ছে। আমাদের সংসার চলে কীভাবে? কত টাকা বেতন-ভাতা পাই? এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে করে আসার কদিন পর ওই মামলাটি বাহিনী সদর দপ্তরের নির্দেশে পিবিআইকে হস্তান্তর করেছি।
সার্বিক বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে অর্থনৈতিক সংকট আছে, এসব দিক বিবেচনা করেই সরকারকে সব ম্যানেজ করতে হয়। এসব সীমাবদ্ধতা নিয়েই পুলিশকে কাজ করতে হয়। পুলিশের অনেক প্রয়োজনীয়তা আছে, এসব মিলিয়ে জোড়াতালি দিয়েই চলতে হয়। এ বিষয়গুলো যখন সামনে আসে সরকারকে বললে প্রয়োজন মেটায়, তবে আমরা যেভাবে চাই হয়তো সেভাবে পাই না।
বিশেষজ্ঞ মত : মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণেই দুর্নীতি আর অপরাধের সুযোগ তৈরি হয়। তদন্তের জন্য তাদের প্রণোদনা ও লজিস্টিক সাপোর্ট না দিয়ে চাপের মুখে রাখায় পুলিশকে অন্য উপায় খুঁজতে হচ্ছে। পুলিশি পদ্ধতিতে (সিস্টেম) বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। এ কারণে পুলিশ দুর্নীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছে। যারা ভুক্তভোগী তারাও এটার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে; ক্রিমিনালরা এর সুযোগ নিচ্ছেন। এ থেকে উত্তরণে পুলিশের ইনভেস্টিগেশনের জন্য আর্থিক ব্যয় বিবেচনা করে বাজেট করা উচিত। অন্যথায় তারা পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করতে পারবে না।
সার্বিক বিষয়ে ড. উমর ফারুক বলেন, একজন তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটটা দিচ্ছে তা নামমাত্র, দায়িত্ব এড়ানোর জন্য। কারণ তিনি লজিস্টিক বা আর্থিক সাপোর্ট ঠিকমতো পান না। এ ছাড়া তাকে এত দায়িত্ব পালন করতে হয় যে, মামলার গভীরে যেতে পারেন না, ফলে অপরাধীরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। এ জায়গাগুলো শনাক্ত না করা হলে শুধু পুলিশকে দোষ দিয়ে লাভ হবে না। পুলিশের প্রশিক্ষণও পর্যাপ্ত না। পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে যা করা হয়, তা নামমাত্র, ইনভেস্টিগেটিভ পুলিশিংয়ের জন্য এটা যথাযথ না।
তদন্ত ব্যাহত হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে ড. উমর ফারুক বলেন, বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত একটা আইন তৈরি করা হয়নি ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন। এটা না থাকার কারণে তদন্ত ব্যাহত হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এটা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত দুর্নীতি হবেই। এদিকে সাক্ষী যখন সাক্ষ্য দিতে যাবে তার প্রণোদনার জন্য রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা রাখে না। একজন সাক্ষী সকাল থেকে বিকেল থাকে তার থাকা-খাওয়ার খরচ সরকার বহন করে না। তাহলে একজন ব্যক্তি সাক্ষী দিতে আসবে কেন? সাক্ষী না আসায় ৬০ শতাংশ মামলায় মেরিট নষ্ট হয়ে যায়।
এ সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে ড. উমর ফারুক বলেন, গবেষণার রিপোর্টে দেখছি, যত মামলা হচ্ছে তার ৬০ শতাংশ মামলার চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণভাবে, যা বিজ্ঞাননির্ভর না এবং সেটা তদন্ত কর্মকর্তার খামখেয়ালিপনার কারণে। তারা এটা করত না, যদি সরকার তাদের পর্যাপ্ত সাপোর্ট দিত। এটার উন্নতি না হলে এটা থেকেই যাবে। এটার সমাধানের জন্য সরকার আমাদের দায়িত্ব দিলে আমরা রাষ্ট্র বা সরকারকে একটা প্রেসক্রাইব দেব, কী করতে হবে। তাহলে পুলিশ এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে এবং ভুক্তভোগীরাও ন্যায়বিচার পাবেন।