এক বছরের কাজ শেষ হবে ১৬ বছরে!

রাজধানীর গুলিস্তান-রামপুরা-বাড্ডা থেকে মগবাজার-তেজগাঁও-গুলশান অংশের চলাচলকে গতিশীল করেছে হাতিরঝিলের তিনটি ব্রিজ ও সড়ক। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় মধুবাগ-নতুন রাস্তা সংযোগ সড়ককে। এই রাস্তা ছাড়া রামপুরা মহানগর প্রকল্প দিয়ে হাতিরঝিলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া-আসা করা যায়। কিন্তু মহানগর প্রকল্পের ভেতরে সেই রাস্তাটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ায় যানজট লেগেই থাকে। এ ছাড়া হাতিরঝিলের শেষ প্রান্ত বাড্ডা দিয়ে রামপুরা অংশে আসতে প্রায় চার কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ হাতিরঝিল-নতুন রাস্তা সংযোগ সড়কে প্রবেশ করতেই গোটা গোটা অক্ষরে ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্র্তৃপক্ষের (ওয়াসা) পক্ষ থেকে ‘দুঃখ প্রকাশ’ লেখা বিলবোর্ড চোখে পড়ে। গত বছর অক্টোবর মাসে চার মাসের কথা বলে দুঃখ প্রকাশের বিলবোর্ড টাঙিয়েছিল ওয়াসা, এখনো তা অক্ষত রয়েছে। কবে এই দুঃখ প্রকাশ শেষ হবে তা না ঠিকাদার, না ওয়াসা কেউই বলতে পারছে না।

ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাইক্রো টানেলিং প্রকল্পের ১২ কিলোমিটারের মধ্যে মাত্র আধা কিলোমিটার অর্থাৎ ৫০০ মিটারের কাজ শেষ হয়েছে। আগামী নভেম্বরে এই প্রকল্পের সব কাজ শেষ হওয়ার কথা। হিসাবে বলছে, গত আট মাসে ৫০০ মিটারের কাজ হওয়ার অর্থ প্রতিমাসে ৬২ দশমিক ৫ মিটারের খননকাজ করেছে ঠিকাদার। এই গতিতে কাজ হলে পুরো ১২ কিলোমিটারের খননকাজ শেষ করতে সময় প্রয়োজন হবে ১৯২ মাস বা ১৬ বছর।

এই প্রকল্পে ১২ কিলোমিটার মাইক্রো টানেলিংয়ের সঙ্গে পাগলাতে একটি পাম্প স্টেশন রয়েছে। সব মিলিয়ে ৪০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি)। বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও এশীয় ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। এটি দেশের প্রথম মাইক্রো টানেলিং স্যানিটেশন প্রকল্প।

ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণাংশের মালিবাগ, রামপুরা, মগবাজার, নিউমার্কেট, নবাবগঞ্জ, আজিমপুর, আরামবাগ, খিলগাঁও, বাসাবো, মুগদা, মানিকনগর, গোলাপবাগ, সায়েদাবাদ, ফরিদাবাদ, দয়াগঞ্জ, জুরাইন, কদমতলী ও পাগলা এলাকার প্রায় ৫২০ বর্গকিলোমিটার এলাকার প্রায় এক কোটি মানুষের টেকসই পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে ওয়াসা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছে। এজন্য রাজধানীর মধুবাগ থেকে পাগলা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার মাইক্রো টানেলিং অর্থাৎ মাটির ৩০ মিটার নিচ দিয়ে পাইপ বসানো হচ্ছে। রাস্তা পুরো না খুঁড়ে মাটির নিচ দিয়ে পাইপ বসানোতে জনসাধারণের দুর্ভোগ কম হওয়ার কথা, কিন্তু ঠিকাদার এই কাজ করতে গিয়ে এত বেশি সময় নিচ্ছে যে জনদুর্ভোগের সব মাত্রা অতিক্রম করেছে।

বৃহস্পতিবার প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাইক্রো টানেলিংয়ের জন্য যে মেশিন কাজ করে তা বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, প্রায় মাসখানেক ধরে এই মেশিন বন্ধ রয়েছে। মাইক্রো টানেলিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর রাস্তার মধ্যে কূপ খনন করা হয়। এরপর দুই কূপের মধ্যবর্তী অংশের মাটি যন্ত্র দিয়ে কেটে পানি প্রবাহের মাধ্যমে তরল করে তুলে এনে কংক্রিটের পাইপ বসানো হয়। প্রকল্পে যারা কাজ করছিলেন তাদের একজন জানান, মাটি খুঁড়তে গিয়ে নিচে শক্ত কিছু পাওয়া গেছে, যা অতিক্রম করা কঠিন হচ্ছে। এজন্য তাদের কাজে বিঘ্ন ঘটেছে। কবে নাগাদ শেষ হবে জানতে চাইলে তিনি কিছু বলতে পারেননি। তবে তার সঙ্গে থাকা চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একজন ব্যক্তি নিজের ভাষার বাইরে অন্য ভাষা না বোঝাতে তার কাছ থেকেও কিছু জানা যায়নি।

স্থানীয়রা কী বলছেন

মা লন্ড্রির স্বত্বাধিকারী সঞ্জয় কুমার জানান, গত অক্টোবর থেকে রাস্তাটি বন্ধ রয়েছে। শুরুতে চার মাসের কথা বলে রাস্তা বন্ধ করা হয়। কিন্তু এখন সেই চার মাস আট মাসে পড়েছে, কাজের কিছুই হয়নি। কবে শেষ হবে তাও এখানকার কেউ বলতে পারে না। জিরো ফুডের বিক্রয়কর্মী ফজলে রাব্বি জানান, তিনি এখানে ছয় মাস আগে এসেছেন। এসেই দেখছেন রাস্তাটি বন্ধ। এখনো বন্ধই আছে। মা সুফিয়া জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী বাসার মোল্লা জানান, গুলশান-তেজগাঁও এলাকার সঙ্গে রামপুরা অংশের প্রধান সংযোগ সড়ক এটি। ফলে এই এলাকার মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অফিস যাওয়া এবং অফিস ছুটির সময় অন্তত এক থেকে দেড় ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় লাগছে সাধারণ বাসিন্দাদের। আশপাশের প্রত্যেকটি সংযোগ সড়কে তীব্র যানজট দেখা দিচ্ছে। কিন্তু কাজের যে অবস্থা, তাতে কবে এই কাজ শেষ হবে তা বলা কঠিন। কাজ শুরুর আগে ওয়াসার পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল তাতে বলা হয়েছিল, গত বছর ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছর ১ জানুয়ারি পর্যন্ত রাস্তাটি বন্ধ রাখা হবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, মাটির নিচে ২০০ পাইপ বসানোর কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত বসেছে মাত্র ২৭টি।

প্রকল্প পরিচালক কী বলছেন

ওয়াসার ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের পরিচালক সেলিম মিয়া এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পের ১২ কিলোমিটার মাইক্রো টানেলিংয়ের কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের নভেম্বরে। এ ছাড়া পাগলাতে যে পাম্প স্টেশন রয়েছে, তার কাজ শেষ হওয়ার কথা আগামী বছরের এপ্রিলে। কিন্তু গত বছর প্রকল্প শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত আট মাসে মাত্র ৫০০ মিটার মাইক্রো টানেলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ঠিকাদারকে তাগাদা দিচ্ছি। তাদের চিঠি দিচ্ছি, যাতে দ্রুত কাজ শেষ করে। কিন্তু নভেম্বরে তারা কাজ শেষ করতে পারবে কি না সে বিষয়ে সন্দিহান তিনি নিজেও। এই প্রকল্পে নির্দিষ্ট দূরত্ব ভাগ করে একটি রাস্তা কাটা এবং পাইপ বসানোর কাজ কত দিনে শেষ করা হবে এমন কোনো বিভাজন নেই বলেও জানান তিনি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীর বক্তব্য : জরুরি যোগাযোগের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যেসব নম্বর দিয়ে রেখেছে, তাদের মধ্যে প্রকল্পের সুপারভাইজার মাহফুজ আহমেদ বলেন, সিটি করপোরেশন চার মাস করে কাজের অনুমতি দেয়। সে জন্য তারা শুরুতে চার মাসের কথা উল্লেখ করে নোটিস দিয়েছিল। কিন্তু মাটির নিচে গ্যাস, বিদ্যুতের লাইন থাকার পাশাপাশি আরও অনেক জটিলতা থাকায় তারা বিপাকে পড়েছেন। কাজ শেষ হতে আরও এক বছর মতো সময় প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান তিনি। তবে এর সঙ্গে বর্ষা এবং ঈদের ছুটি যোগ হলে সময় আরও বাড়তে পারে।