হামের টিকা সংকট ও মৃত্যুর তদন্ত হচ্ছে

দেশে হামের টিকা সংকট ও রোগটি সংক্রমিত হয়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে সরকার। গতকাল বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিল্টন হলে এক গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এ তদন্তের কথা জানান। বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। 

দেশে গতকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৯ শিশু মারা গেছে। এ পর্যন্ত  হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৪৩৫ জন। এর মধ্যে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে ২৯১ জন এবং নিশ্চিত হামে ৬১ শিশুর মৃত্যুর হয়েছে। সরকারি হিসাবে গত ৫৬ দিনে মোট মৃত্যু হয়েছে ৩৫২ জনের।

গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বলেন, হামে কেন এতগুলো শিশুর মৃত্যু হলো, এক্ষেত্রে কারও কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তের ফলাফল সাংবাদিকসহ দেশবাসীকে জানানো হবে।

তদন্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব উল্লেখ করে স্বাস্থ্য সচিব আরও বলেন, প্রত্যেকটি ঘটনার তদন্ত হওয়া দরকার। জনগণের জানা দরকার। আমাদের সরকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার, জবাবদিহিমূলক সরকার। আমি বিশ্বাস করি, সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করার জন্য প্রস্তুত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হাম-রুবেলার মতো রোগ প্রতিরোধে টিকার ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন নিয়মিত করা জরুরি। অথচ দেশে ২০২০ সালের পর আর কোনো ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন হয়নি। দেশের হাম আক্রান্ত শিশুদের রোগের ধরন ও অন্যান্য জটিলতা নিরূপণের জন্য ইতিমধ্যে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (আইইডিসিআর) জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের অনুরোধ করেছি। হাম ও হামের উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুদের ডেথ রিভিউয়ের বিষয়টি আমরা জাতীয় টিকাদান সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপে (নাইট্যাগ) উপস্থাপন করব। তারা পরামর্শ দিলে আমরা শিগগিরই ডেথ রিভিউ শুরু করব। আমার বিশ্বাস প্রত্যেকে তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে এলে হাম মোকাবিলা দ্রুত সম্ভব হবে।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, কোনো মহামারী দেখা দিলে বিষয়টি আমরা স্বীকার করি না। মহামারী ঘোষণা করি না। কিন্তু মহামারী মোকাবিলায় কাজ করি। অথচ পরিস্থিতি স্বীকার করে কাজ করলে উত্তরণ সহজ হয়। হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি ন্যাশনাল গাইডলাইন প্রণয়ন করে সমন্বিতভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, জাতিগতভাবেই আমাদের একটি সমস্যা রয়েছে। আমরা কোনো সমস্যাকে সাধারণ মানুষের কাছে স্বীকার করি না। অন্যের ওপর দায় চাপানোর রাজনীতিও বিদ্যমান রয়েছে। অথচ এসব দায় চাপানোর রাজনীতি বন্ধ করে দেশের সমস্যাকে স্বীকার করে কীভাবে উত্তরণের পথ খোঁজা যায় এ নিয়ে আলোচনা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সারা বিশ্বে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত মৃত্যুহার বাড়েনি। দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দুই মাস থাকবে। এরপর কমতে শুরু করবে। কিন্তু মুশকিল হলো পরিত্রাণের পর আমরা আবার হাম মোকাবিলার কথা ভুলে যাব। এই কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, হাম আক্রান্তের একটি কারণ ম্যাল নিউট্রেশন। মানুষ যেখানে বেঁচে থাকতে হিমশিম খায় সেখানে কীভাবে তারা পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করবে? বস্তিবাসী কেউ            সন্তান হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে হামের লক্ষণ নিয়ে, হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছে বাসায় নিয়ে যান। পরিস্থিতির অবনতি হলে নিয়ে আসবেন। তার মানে কি আমরা অবনতির দিকে কাউকে ঠেলে দিচ্ছি? বস্তিতে কিংবা নিম্নœ আয়ের মানুষ যেখানে ঠিকমতো তিনবেলা খেতে পারে না, তারা কীভাবে বাড়িতে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা করে কোয়ারেন্টাইন করবে? এই সমস্যার সমাধানে কমিউনিটি কোয়ারেন্টাইন জরুরি। একই সঙ্গে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে একটি কর্মকৌশলের আলোকে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বলেন, এটি শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, ভিটামিন এ-এর অভাবে অন্ধত্ব এবং বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত জ্বর, খেতে না পারা কিংবা তীব্র ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় পোলিও ও হাম-রুবেলা ল্যাবরেটরির সাবেক প্রধান এবং জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল বলেন, হাম-রুবেলা প্রতিরোধে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি করা সবচেয়ে জরুরি। এতে ইমিউনিটি বৃদ্ধি পায়। আমাদের মধ্যে আবার হামের পুরনো ভাইরাস ফিরে এসেছে। এটা দেশীয় ভাইরাস। ভ্যাকসিনেশন গ্যাপ, ইমিউনিটি গ্যাপ আর ব্রেস্ট ফিডিংয়ের অভাবে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, সম্প্রতি বছরে সারা দেশে শিশুদের প্রথম ছয় মাস মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রবণতা কমে এসেছে। ছয় মাস শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। নিয়মিত ভ্যাকসিন নিতে হবে। সেই সঙ্গে শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে হাম-রুবেলাসহ অন্যান্য রোগ থেকে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে।

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান, টিকা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর.বি) সাবেক গবেষক ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি, বিএমইউর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ।

হামে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৯ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে তিন শিশুর হাম শনাক্ত এবং ছয় জনের হামের উপসর্গ ছিল। গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে ২৯১ জন এবং নিশ্চিত হামে ৬১ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৪৮৯ জনের শরীরে এবং সন্দেহজক হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ৯৪৬ জনের। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৪৩৫ জন রোগী পাওয়া গেছে।  সরকারি হিসাবে গত ৫৬ দিনে ৩৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে বরিশাল বিভাগে তিনজন, ঢাকায় তিনজন, খুলনায় দুইজন এবং সিলেটে একজন মারা গেছে।  একই সময়ে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৪৩৭ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। আর নিশ্চিত হামে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮৭ জনের।  

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ৪৭ হাজার ৬৫৬ জনের শরীরে। আর এই সময়ে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৩ হাজার ৬৩১ জন। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ৬ হাজার  ৯৭৯ জন। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত  হাম থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ২৯ হাজার ৭৪৬ জন।

সরকারি হিসাবে বিভাগওয়ারি মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে ৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর এ বিভাগে ‘সন্দেহজনক হামে’ মৃত্যু হয়েছে ১৩৫  জনের। এরপরেই রয়েছে রাজশাহী বিভাগে ৭৮ জন, চট্টগ্রামে ২৫ জন, সিলেটে ২২  জন, খুলনায় ১৮ জন, বরিশালে ১২ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একজন। তবে রংপুর বিভাগে এখন পর্যন্ত কারও মৃত্যু হয়নি।