ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হতে চলেছে: পুতিন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান হতে চলেছে বলে তিনি মনে করছেন। শনিবার (৯  মে) মস্কোর ক্রেমলিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই ইতিবাচক ইঙ্গিত দেন। তবে এই বক্তব্যের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই রাশিয়ার বার্ষিক বিজয় দিবসের প্যারেড অনুষ্ঠানে তিনি ইউক্রেনে চূড়ান্ত বিজয়ের অঙ্গীকার করেছিলেন।

ইউরোপের মাটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিয়ে পুতিন বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে বিষয়টি (যুদ্ধ) এখন শেষের দিকে চলে এসেছে।’

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট আরও জানান, তিনি ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য নতুন কোনো ব্যবস্থায় সমঝোতা করতে প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে আলোচনার জন্য তার পছন্দের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোডারের নাম উল্লেখ করেন তিনি।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে মস্কোর সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল সংকটের পর সবচেয়ে প্রতিকূল অবস্থায় পৌঁছেছে। এতদিন ক্রেমলিন বলে আসছিল যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া শান্তি আলোচনা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। পুতিন বারবার বলে আসছিলেন, রাশিয়ার 'বিশেষ সামরিক অভিযানের' লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। তবে শনিবারের বক্তব্যে সুর কিছুটা নরম হতে দেখা গেছে।

৯ মে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয় স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতি বছর রেড স্কয়ারে রাশিয়ার সামরিক শক্তির বিশাল প্রদর্শনী হয়। তবে এবারের প্যারেড ছিল বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি জৌলুসহীন। বড় কোনো আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ট্যাংকের বহরের পরিবর্তে ক্রেমলিনের দেওয়ালে বিশাল পর্দায় রুশ সামরিক সরঞ্জামের ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।

উল্লেখ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (যাকে রাশিয়ায় ‘গ্রেট প্যাট্রিওটিক ওয়ার’ বলা হয়) যে সময় ব্যয় করেছিল, বর্তমান ইউক্রেন যুদ্ধ তার চেয়েও দীর্ঘায়িত হয়েছে। কয়েক লক্ষ মানুষের মৃত্যু, ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংস হওয়া এবং রাশিয়ার ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপের ফলে মস্কোতে এখন এক ধরণের উদ্বেগ বিরাজ করছে।

রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করলেও চলতি বছরে তাদের অগ্রযাত্রা ধীর হয়ে এসেছে। দনবাস অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ইউক্রেনীয় বাহিনী শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

এদিকে, একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। দুই পক্ষই ১০০০ জন করে যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে রাজি হয়েছে। ওয়াশিংটনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এই যুদ্ধ বন্ধ দেখতে চাই। প্রতি মাসে ২৫ হাজার তরুণ সৈনিকের মৃত্যু উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি এই যুদ্ধবিরতির বড় ধরণের মেয়াদ বৃদ্ধি দেখতে চাই।’

ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। এই আলোচনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পুতিন সরাসরি গেরহার্ড শ্রোডারের ওপর আস্থা প্রকাশ করেন। পুতিন বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর মিস্টার শ্রোডার।

ইউরোপীয় নেতারা পুতিনকে একজন ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে অভিযুক্ত করলেও এবং পুতিন ইউরোপীয় দেশগুলোকে ‘যুদ্ধবাজ’ বললেও, বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতা যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের ব্যাপারে পুতিন স্পষ্ট করেছেন যে, একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির পরেই কেবল সরাসরি সাক্ষাৎ সম্ভব।

সূত্র: রয়টার্স