যে কারণে ইরান যুদ্ধে পিছু হটল যুক্তরাষ্ট্র

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার পরামর্শে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার লক্ষ্যে হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই পরিকল্পনার অংশ  হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুদ্ধ শুরু করে। তবে তা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার মাধ্যমেই শেষ হতে যাচ্ছে।

এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ওয়াশিংটনের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের তেল, গ্যাস ও পানি শোধন পরিকাঠামো ধ্বংস হলে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেবে। ইরান এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন চড়া মূল্য দিতে বাধ্য করতে পারে যা বহন করা ওয়াশিংটনের পক্ষে অসম্ভব।

ইরানে হামলার ক্ষেত্রে  ট্রাম্প প্রশাসন ধারণা করেছিল, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় যেভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়েছিল, ইরানেও তেমনটি ঘটবে। কিন্তু তেহরানের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন, হামলার মুখে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং ধর্মীয় নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ বহিরাগত আক্রমণের বিরুদ্ধে সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। ফলে দুই মাস যুদ্ধ চালিয়েও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানে কোনো অনুগত সরকার বসানো বা ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার কোনো সামরিক পথ খুঁজে পায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যর্থতার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, মার্কিন নেতৃত্ব ইরানের পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে অবমূল্যায়ন করেছে। দ্বিতীয়ত, গত ৪০ বছরের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান যে উন্নত ব্যালিস্টিক মিসাইল, ড্রোন প্রযুক্তি এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলেছে, সেই কারিগরি সক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াশিংটনের সঠিক ধারণা ছিল না। বর্তমানে যুদ্ধের প্রযুক্তি ইরানের অনুকূলে চলে গেছে, যেখানে ইরানের একটি ড্রোন তৈরিতে মাত্র ২০ হাজার ডলার খরচ হয়, সেখানে সেটি ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের পেছনে খরচ হয় প্রায় ৪০ লাখ ডলার। এই বিপুল আর্থিক ব্যয় মার্কিন সামরিক বাজেটের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার অদূরদর্শিতাকেও এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করা হয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই ছাড়াই মার-এ-লাগোতে বসে ট্রাম্পের অনুগত একটি ছোট গোষ্ঠী এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনেক বিশেষজ্ঞকেই ক্ষুব্ধ করেছে। 

শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখার একটি নিরর্থক প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি হিসেবে মনে করা হচ্ছে যে, ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। তবে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চড়াও হবে না, কারণ রাশিয়া ও চীনের প্রভাবে একটি স্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিবেশ বজায় রাখাই তেহরানের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত লক্ষ্য। মার্কিন প্রশাসনের জন্য এখন সময় এসেছে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির পথে ফিরে আসার।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের অধিকার রক্ষা করা, আত্মসমর্পণ নয় বলে সাফ জানিয় দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। রবিবার (১০ মে) এক বলিষ্ঠ বক্তব্যে তিনি এমনটা জানান। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে প্রকাশিত এই বিবৃতিতে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান কখনোই শত্রুর সামনে মাথা নত করবে না। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেন, সংলাপ বা আলোচনার অর্থ এই নয় যে ইরান তার অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসবে। বরং এই আলোচনার লক্ষ্য হলো ইরানি জাতির অধিকার নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বার্থকে শক্তভাবে রক্ষা করা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি পুনর্গঠন সংক্রান্ত এক টাস্কফোর্স সভায় তিনি এই প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরম রূপ নেয়। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর পাল্টা আঘাত হানে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী আলোচনাগুলো কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলেও, পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করেন। বর্তমানে এই যুদ্ধবিরতিকে ভিত্তি করেই একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সাম্প্রতিক এই মন্তব্য সেই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ইরানের অনড় অবস্থানেরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।