মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ঘিরে যেসব সৌভাগ্যবান মানুষ নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছিলেন, তাদেরই বলা হয় সাহাবি। তারা ছিলেন সত্যের প্রথম সাক্ষী, ওহির প্রথম অনুসারী এবং ইসলামের প্রথম সৈনিক। দুঃসময়ে তারা নবিজি (সা.)-এর পাশে দাঁড়িয়েছেন পাহাড়সম দৃঢ়তা নিয়ে। নির্যাতন সহ্য করেছেন, দেশ ছেড়েছেন, সম্পদ বিসর্জন দিয়েছেন, এমনকি আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন।
সাহাবিদের মর্যাদা এতটাই মহান যে, মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে তাদের প্রতি সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে আল্লাহর রাসুল (সা.) দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এটি ছিল তাদের ইমান, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। বিশেষভাবে দশজন মহান সাহাবির নাম একসঙ্গে উল্লেখ করে নবিজি (সা.) ঘোষণা করেছিলেন যে, তারা জান্নাতি। ইসলামের ইতিহাসে তারা ‘আশারায়ে মুবাশশারা’ নামে পরিচিত। তাদের জীবন মুসলমানদের জন্য আদর্শ, অনুপ্রেরণা ও ইমানি শক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হাদিসে এসেছে, আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আবু বকর জান্নাতি, ওমর জান্নাতি, ওসমান জান্নাতি, আলী জান্নাতি, তালহা জান্নাতি, জুবায়ের জান্নাতি, আবদুর রহমান ইবনে আওফ জান্নাতি, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস জান্নাতি, সাঈদ জান্নাতি এবং আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ জান্নাতি। (সুনানে তিরমিজি) জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির সংক্ষীপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
এক. আবু বকর (রা.) : ইসলামের প্রথম খলিফা এবং পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী হজরত আবু বকর (রা.)। তার আসল নাম আবদুল্লাহ ইবনে ওসমান ইবনে আমর। উপাধি আতিক ও সিদ্দিক। মায়ের নাম উম্মুল খায়র। তার হাতে হজরত ওসমান ইবনে আফফান, হজরত জুবায়ের, হজরত তালহা, হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফের মতো বড় বড় সাহাবিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহর (সা.) সঙ্গী ছিলেন। নবিজির (সা.) মৃত্যুর পর ২ বছর মুসলমানদের খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি ইন্তেকাল করেন।
দুই. ওমর (রা.) : ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনে খাত্তাবের (রা.) মাধ্যমে মহান আল্লাহ ইসলামকে শক্তিশালী করেছিলেন। নবিজি (সা.)-এর নবুয়্যত লাভের কয়েক বছর পর ইসলাম গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে সাহাবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে আবু বকর (রা.)-এর পরই তার নাম উচ্চারিত হতো। আবু বকরের ইন্তেকালের পর তিনি খলিফা হন এবং প্রায় সাড়ে দশ বছর খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার খেলাফতকালে খেলাফাতের সীমানা অকল্পনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। সাসানীয় সাম্রাজ্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দুই তৃতীয়াংশ মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
তিন. ওসমান (রা.) : ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান ইবনে আফফান (রা.) আবু বকরের (রা.) ইসলাম গ্রহণের কিছুদিন পর তার দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি নবিজি (সা.)-এর জামাতা ছিলেন। প্রথমত তিনি নবিজি (সা.)-এর মেয়ে রুকাইয়াকে বিয়ে করেন, রুকাইয়ার ইন্তেকালের পর উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করেন। নবিজি (সা.)-এর দুই মেয়েকে বিয়ে করার কারণে তাকে ‘জিন্নুরাইন’ বা দুটি নুরের অধিকারী বলা হতো। ওমর (রা.)-এর ওফাতের পর তিনি মুসলমানদের খলিফা হন এবং প্রায় বারো বছর খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
চার. আলি (রা.) : ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলি ইবনে আবু তালিব (রা.) ছিলেন নবিজি (সা.)-এর চাচাতো ভাই। তিনি নবিজি (সা.)-এর পরিবারে তার সন্তানের মতো প্রতিপালিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নবিজি (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় মেয়ে ফাতেমা (রা.)-কে বিয়ে করেন। ইসলামের আবির্ভাবের পর বালকবয়সেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মুসলমানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বীর যোদ্ধা। বদর, ওহুদ, খন্দক ও খারবারের যুদ্ধে তিনি অনন্য বীরত্বের পরিচয় দেন। ওসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
পাঁচ. তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) : হজরত তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রা.) ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলামগ্রহণকারী সাহাবিদের অন্যতম। ওহুদ যুদ্ধে নবিজি (রা.)-কে রক্ষা করার জন্য তিনি অনন্য বীরত্বের পরিচয় দেন। নবিজি (সা.)-এর দিকে আসা তীর ও তরবারির প্রায় চব্বিশটি আঘাত তিনি নিজের শরীরে নেন। হজরত আলী (রা.)-এর খেলাফতকালে জামাল যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
ছয়. জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) : হজরত জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) ছিলেন নবিজি (সা.)-এর আপন ফুফু সাফিয়্যার ছেলে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি হাবাশায় হিজরত করেছিলেন। পরবর্তীতে মদিনায় হিজরত করেন। নবিজি (সা.)-এর সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি অনন্য বীরত্বের পরিচয় দেন। হজরত আলী (রা.)-এর খেলাফতকালে জামাল যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
সাত. আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) : আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ইসলামের প্রাথমিক যুগে হজরত আবু বকর (রা.)-এর দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী আট সাহাবির অন্যতম। তিনিও হাবশায় হিজরত করেছিলেন। পরবর্তীতে মদিনায় হিজরত করেন। হজরত ওমর (রা.) যে ছয়জন ব্যক্তিকে তার পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ছিলেন তাদের অন্যতম। হজরত ওসমান (রা.)-কে খলিফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৩১ হিজরিতে ৭২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
আট. সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) : হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ইসলামের প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। ইসলামের পক্ষে প্রথম তীর নিক্ষেপ করেছিলেন তিনি। বদর, ওহুদসহ নবিজির নেতৃত্বে হওয়া প্রতিটি যুদ্ধে তিনি অংশ গ্রহণ করেন। হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনকালে তার নেতৃত্বে মুসলমান সেনাবাহিনী সাসানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী জয় করে। ৫৫ হিজরিতে ৮৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
নয়. সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা.) : হজরত সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা.) প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবিদের অন্যতম। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি পৌত্তলিকতামুক্ত ছিলেন। তিনি হজরত ওমর (রা.)-এর বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাবের স্বামী ছিলেন। বদর যুদ্ধ ছাড়া অন্য সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে ৮০ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
দশ. আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.) : হজরত আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.) ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি হাবাশা ও মদিনায় হিজরত করেন। নবিজি (সা.)-এর নেতৃত্বে হওয়া প্রায় সব যুদ্ধে তিনি অংশ নেন। হজরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে তিনি মুসলমানদের একটি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। তার নেতৃত্বে মুসলমানরা ইয়ারমুকের ময়দানে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিশাল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে। তার নেতৃত্বে সিরিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর বিজিত হয়। হজরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালেই প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন।
এ ছাড়া অনেক সাহাবির মৃত্যু বা শাহাদাতের পর নবিজি (সা.) অন্যান্য সাহাবিদের জানিয়েছিলেন যে, তিনি জান্নাত লাভ করেছেন। এ রকম সাহাবির সংখ্যা ১০ জন নয়, বরং আরও অনেক বেশি। তবে জান্নাতের সুংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি হিসেবে ১০ জন শ্রেষ্ঠ সাহাবির নাম বিশেষভাবে আলোচিত হয়, কারণ একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে নবিজি (সা.) একসাথে তাদের নাম বলেছেন এবং সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন তারা জান্নাতি।