ফ্রান্সের সমুদ্রতীরবর্তী শহর কান আবারও পরিণত হয়েছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের মিলনকেন্দ্রে। বর্ণাঢ্য আয়োজন, তারকাখচিত উপস্থিতি এবং লাল গালিচার জৌলুসে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব। কানের ঐতিহাসিক পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রযোজক ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতিতে উৎসবের প্রথম দিনই ছিল প্রাণবন্ত।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই লাল গালিচাকে ঘিরে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। আন্তর্জাতিক তারকাদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চীনের খ্যাতিমান অভিনেত্রী গং লি এবং হলিউড অভিনেত্রী জেন ফন্ডা। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের সূচনা ঘোষণা করেন। বক্তব্যে জেন ফন্ডা বলেন, চলচ্চিত্র প্রতিরোধের শক্তিশালী ভাষা, কারণ গল্পই সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে। গং লি বলেন, সিনেমা ভাষা ও সংস্কৃতির সীমা পেরিয়ে মানুষের আবেগকে একত্রিত করে।
আয়োজকরা তাদের বক্তব্যে বিশ্ব চলচ্চিত্রে কান উৎসবের ঐতিহ্য ও প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক সংকট, যুদ্ধ ও বিভাজনের সময়ে চলচ্চিত্র মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। এবারের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নিচ্ছে ২২টি চলচ্চিত্র। স্পেনের পেদ্রো আলমোদোভার, যুক্তরাষ্ট্রের জেমস গ্রে এবং রোমানিয়ার ক্রিস্টিয়ান মুঙ্গিউসহ বিশ্বখ্যাত নির্মাতাদের নতুন চলচ্চিত্র স্থান পেয়েছে প্রতিযোগিতায়। সামাজিক বাস্তবতা, যুদ্ধ, মানবিক সংকট, প্রেম ও সমকালীন রাজনীতি ঘিরে নির্মিত এসব চলচ্চিত্র নিয়ে ইতোমধ্যে দর্শক ও সমালোচকদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
উদ্বোধনী দিনে প্রদর্শিত হয় বিশেষ চলচ্চিত্র ‘ইলেকট্রিক ভেনাস’। প্রদর্শনীর পর দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায় ছবিটি। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নির্মাতাদেরও পরিচয় তুলে ধরা হয় অনুষ্ঠানে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এবার সম্মানসূচক ‘পাম দ’অর’ প্রদান করা হয় নিউজিল্যান্ডের খ্যাতিমান নির্মাতা পিটার জ্যাকসনকে। সম্মাননা গ্রহণ করে ‘লর্ড অব দ্য রিংস’ ট্রিলজির এই নির্মাতা বলেন, ‘কান উৎসবে এমন স্বীকৃতি পাব, কখনো ভাবিনি।’
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ফরাসি অভিনেত্রী আই হাইদারা। বক্তব্যে তিনি ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বাস্তবতার সংকট নিয়ে মন্তব্য করেন। তার কথায় শিল্প ও রাজনীতির সম্পর্কের প্রসঙ্গও উঠে আসে। এদিকে জুরি বোর্ডের সভাপতি দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা পার্ক চান-উক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শিল্প ও রাজনীতিকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রসঙ্গও গুরুত্ব পেয়েছে এবারের উৎসবে।
জুরি সদস্য ও হলিউড অভিনেত্রী ডেমি মুর বলেন, ‘এআই এখন বাস্তবতা। এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার চেয়ে সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ মূল প্রতিযোগিতা ছাড়াও এবারের আয়োজনে থাকছে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, শিক্ষার্থী নির্মাতাদের বিভাগ এবং বিশেষ প্রদর্শনী। প্রতিদিন চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে সংবাদ সম্মেলন, মতবিনিময় সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ফলে পুরো কান শহর এখন উৎসবের আবহে মুখর। বিশ্লেষকদের মতে, কান চলচ্চিত্র উৎসব শুধু একটি আন্তর্জাতিক আয়োজন নয়; এটি বিশ্ব সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এখান থেকেই প্রতিবছর উঠে আসে নতুন নির্মাতা, নতুন ধারা এবং নতুন চলচ্চিত্র ভাবনা সব মিলিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্ব চলচ্চিত্রপ্রেমীদের সামনে নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন আলোচনার দ্বার খুলে দেবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।