বাংলাদেশের শিল্পকলার বিস্তৃত ও বর্ণাঢ্য ক্যানভাসে এক বহুমাত্রিক ও উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম রফিকুন নবী। চারুকলার আঙিনায় তিনি যেমন একজন উঁচু দরের চিত্রকর, জলরঙ ও ছাপচিত্রের দক্ষ রূপকার; তেমনি সাধারণ মানুষের কাছে তিনি আপন হয়ে আছেন ‘রনবী’ ছদ্মনামে কালজয়ী ও কাল্পনিক চরিত্র ‘টোকাই’-এর অনন্য স্রষ্টা হিসেবে। চিত্রকলার বিভিন্ন শাখায় তার স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ, তীক্ষè সমাজসচেতনতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধ তাকে বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র ও স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
শিল্পের হাতেখড়ি
১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোবরাতলা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন রফিকুন নবী। তার পৈতৃক নিবাস শিবগঞ্জের ছত্রাজিতপুরে। তার পিতা রশীদুন নবী ছিলেন পেশায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা, কিন্তু তার অন্তরে বাস করত একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী। পিতার প্রবল ইচ্ছা ছিল কলকাতা আর্ট স্কুলে পড়ার, প্রখ্যাত ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর কাছে কিছুকাল তালিমও নিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের পিতার আপত্তিতে তার আর শিল্পী হওয়া হয়ে ওঠেনি। নিজের সেই অপূর্ণ স্বপ্ন তিনি পরম যতেœ বুনে দিয়েছিলেন ছেলে রফিকুন নবীর চোখে।
পিতার বদলির চাকরির সুবাদে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে তার শৈশব কাটলেও, কৈশোর ও যৌবনের বড় অংশ কেটেছে পুরান ঢাকায়। পোগোজ ও প্রগতি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তার আঁকাআঁকির হাত মানুষের নজর কাড়ে। স্কুলে যাওয়ার শুরুর দিককার দিনগুলোতে, বাবা তাকে বর্ণমালা শেখানোর আগে সেøটে পাখি, হাতি বা আমের ছবি এঁকে দেখাতেন। পরবর্তী সময় কলকাতার ‘প্রবাসী’, ‘বসুমতী’ বা ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার পাতায় ছাপা হওয়া বিখ্যাত শিল্পীদের রিপ্রোডাকশন দেখে তার মনের ভেতর শিল্পের বীজ আরও গভীরভাবে রোপিত হয়। ১৯৫৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অঙ্কে একটু খারাপ করায় প্রথম বিভাগ হাতছাড়া হয় তার। এই সামান্য ‘না হওয়াটাই’ যেন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দিকে। পিতার একান্ত ইচ্ছায় তিনি ভর্তি হন ঢাকার আর্ট কলেজে।
শিল্পশিক্ষার আঙিনা
আর্ট কলেজে রফিকুন নবী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, শফিউদ্দীন আহমেদ, এস এম সুলতানের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের। প্রথম বর্ষে পড়াকালীন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তাদের বলেছিলেন, ‘আমরা তোমাদের গ্রামারটা শিখিয়ে দিতে পারব। তার মধ্যে কী রস তুমি দিতে পারবে, তা তোমার নিজের প্রচেষ্টা... শুধু ছবি আঁকলে চলবে না, দেশ নিয়ে ভাবতে হবে।’ গুরুর এই বাণী রফিকুন নবী আজীবন হৃদয়ে ধারণ করেছেন।
১৯৬৪ সালে স্নাতক পাসের পরদিন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে মাত্র ১৮০ টাকা বেতনে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন রফিকুন নবী। অথচ তখন বাইরের বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করে তিনি মাসে ২৭৫ টাকা আয় করতেন। কিন্তু জয়নুল আবেদিনের মতো ব্যক্তিত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কথা তিনি বা তার পিতা কেউই ভাবতে পারেননি। পরবর্তী সময় ১৯৭৩ সালে গ্রিস সরকারের বৃত্তি নিয়ে এথেন্স স্কুল অব ফাইন আর্টসে প্রিন্ট মেকিংয়ের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপি
কেবল তুলি আর ক্যানভাসেই নয়, দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটেও রফিকুন নবী ছিলেন সম্মুখসারিতে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন সবকিছুর প্রভাব তার মননে রেখাপাত করেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বন্ধুরা যখন রণাঙ্গনে, তিনি তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থেকে যান ঢাকায়। পুরান ঢাকার নারিন্দায় নিজের গোপন আস্তানা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ, কাপড়, ওষুধ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তিনি সম্পন্ন করেছেন অসীম সাহসিকতার সঙ্গে।
‘টোকাই’
রফিকুন নবীকে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আপন করেছে তার অমর সৃষ্টি ‘টোকাই’। সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় নিজের আসল নাম লুকিয়ে কার্টুন আঁকতেন ‘রনবী’ ছদ্মনামে। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে রাস্তার মিছিলের সামনের সারির ছিন্নমূল শিশু এবং নিজের বাড়ির সামনের বারান্দায় আশ্রয় নেওয়া ‘মোক্কা’ নামের এক পেটমোটা পথশিশুর প্রতিচ্ছবি থেকে তার মাথায় আসে এক নতুন চরিত্র সৃষ্টির ভাবনা। দীর্ঘ আট বছর পর, ১৯৭৮ সালের ১৭ মে ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার প্রারম্ভিক সংখ্যায় জন্ম নেয় আট বছরের অনাথ শিশু ‘টোকাই’।
মাথায় গুটিকতক চুল, মোটা পেটে কষে বাঁধা খাটো চেক লুঙ্গি পরা এই টোকাই বয়সে বাড়ে না, কিন্তু তার জীবনবোধ বড় প্রখর। সে ডাস্টবিনের পাশে থাকে, কথা বলে কাক, গরু, ছাগল বা মানুষের সঙ্গে। তার সেই বুদ্ধিদীপ্ত ও রসালো কথোপকথনে লুকিয়ে থাকে সমাজের ভণ্ডামি, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও রুগ্ন রাজনীতির প্রতি চরম ব্যঙ্গ। চরিত্রটি এতই জনপ্রিয়তা পায় যে, তৎকালীন সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ এর নাম পরিবর্তন করে ‘পথকলি’ রাখার কথা বলেছিলেন। কিন্তু মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় ‘টোকাই’ আজ বাংলা অভিধানে স্থান করে নেওয়া একটি নিজস্ব শব্দ।
গণজীবনের রূপকার
রফিকুন নবীর শিল্পজগতের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে মানুষ বিশেষত নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ। নাগরিক জীবনের আরামদায়ক ড্রয়িংরুম ছেড়ে তার তুলি বারবার ছুটে গেছে খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কাছে। তার ছবিতে মানুষ কখনো একা নয়, বরং যূথবদ্ধ জীবনের এক অসীম শক্তির প্রতীক হয়ে তারা ক্যানভাসে ধরা দেয়।
নদীর বুকে জাল ফেলা জেলেদের নিয়ে তার যে সুবিশাল চিত্রগুচ্ছ রয়েছে, তাতে মূর্ত হয়ে ওঠে বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের অদম্য সংগ্রাম। বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার যে হার-না-মানা জেদ, তা রফিকুন নবীর তুলিতে এক মহাকাব্যিক রূপ পেয়েছে।
তার নিঃসর্গ দৃশ্যগুলোতে কেবল বিশুদ্ধ প্রকৃতি থাকে না; সেখানে মানুষ, বাড়িঘর ও যানবাহনের পাশাপাশি বিপন্ন পরিবেশের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থাকে। গ্রামীণ এবং নাগরিক জীবনের বিভাজন বোঝাতে তিনি তার ছবিতে অভিনব দুটি প্রতীক ব্যবহার করেছেন। তার গ্রামীণ দৃশ্যপটে মোষের সদর্প উপস্থিতি যেমন গ্রামবাংলার শ্রমনির্ভর জীবনের কথা বলে, তেমনি নাগরিক জীবনের কোলাহল ও যান্ত্রিকতার প্রতীক হয়ে তার ছবিতে বারবার উড়ে আসে ‘কাক’।
মাধ্যম ও আঙ্গিকের বিদ্রোহ
সব মাধ্যমেই রফিকুন নবীর অবাধ ও স্বচ্ছন্দ বিচরণ। একটি সাধারণ ড্রয়িংয়ে তিনি যেমন পেন্সিলের সূক্ষ্ম রেখায় লিরিক্যাল বা ছন্দময় দৃশ্য ফুটিয়ে তোলেন, তেমনি প্যাস্টেল বা ব্রাশের মোটা দাগে তৈরি করেন টানটান উত্তেজনা ও নাটকীয়তা। জলরঙের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কঠিন মাধ্যমে তিনি অসামান্য দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। গরুর গাড়ির জটিল কম্পোজিশন ‘জার্নি’ কিংবা কক্সবাজার ও টেকনাফের সমুদ্রের অপরূপ বিশালতা তার জলরঙেই সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
গ্রিসের এথেন্স থেকে প্রিন্ট মেকিংয়ে শিক্ষা নেওয়া এই শিল্পী দেশে ফিরে উডকাট বা ছাপচিত্রের চিরায়ত ধারণাই পাল্টে দিয়েছেন। তার উডকাটগুলো আকারে যেমন সুবিশাল, রঙেও তেমনি অ্যাক্রিলিক বা তেলরঙের মতো প্রখর ও উজ্জ্বল। বর্তমানে তার সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম অ্যাক্রিলিক। অ্যাক্রিলিকের বিশাল ক্যানভাসে পার্সপেক্টিভ বা পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে তিনি দারুণ সব নিরীক্ষা করেছেন।
একজন আধুনিক শিল্পী হিসেবে রফিকুন নবী তার ছবিতে বেশ কিছু প্রথা ভেঙেছেন। আনুভূমিক ও উল্লম্ব দূরত্বকে একাকার করে দেওয়া, কিংবা রোমের সিস্টিন চ্যাপেলে মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ‘ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম’ ছবির অ্যাডামের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ‘টাইম অ্যান্ড স্পেস’-এর সীমারেখা মুছে দেওয়ার মতো সাহসী কৌতুক তিনি করেছেন। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতীকের ধার না ধেরে, নিছক নিজের আনন্দ ও নন্দনতাত্ত্বিক স্বাধীনতার জায়গা থেকে ক্যানভাসে আল্টরামেরিন নীল রঙের ব্যাপক ব্যবহার করেছেন তিনি।
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক (১৯৯৩), শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিক চারুকলা প্রদর্শনীতে বিশ্বের ৮০টি দেশের শিল্পীদের মধ্যে তিনি ‘এক্সিলেন্ট আর্টিস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবেও মনোনীত হন।
এত বিশাল অর্জন ও খ্যাতির পরও রফিকুন নবী মনে করেন, শিল্পের জগতে পুরোপুরি তৃপ্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই অতৃপ্তিই তাকে প্রতিনিয়ত নতুন সৃষ্টির অনুপ্রেরণা জোগায়।