ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বিদেশ ফেরত রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বহু রেমিট্যান্স যোদ্ধা দেশে ফিরে পড়েছিলেন চরম অনিশ্চয়তায়। কেউ চাকরি হারিয়ে, কেউ প্রতারণার শিকার হয়ে, আবার কেউ অসুস্থ হয়ে ফিরে নতুন জীবন শুরু করতে হিমশিম খেয়েছেন। তবে সরকারের রেইজ প্রকল্পের রিইন্টিগ্রেশন কর্মসূচির আওতায় প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ঋণ ও পুনর্বাসন সহায়তা পেয়ে এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন হাজারো বিদেশ ফেরত কর্মীরা।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিদেশ ফেরত কর্মীদের ডেটাবেইজ তৈরি, মনোসামাজিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সেলিং, ব্যবসা পরিকল্পনায় সহায়তা, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং স্বল্পসুদে ঋণ প্রাপ্তিতে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে বেকারত্ব কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সংখ্যা।

রেইজ প্রকল্পের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রবাসী কর্মী নিবন্ধন, ওরিয়েন্টেশন ও কাউন্সেলিং কার্যক্রমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার জন, বাস্তবায়ন হয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ২২৬ জন। প্রণোদনা কার্যক্রমে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২ লাখ ৫০ হাজার জনকে সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও সুবিধাভোগী হয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ২২৬ জন। এ খাতে ৩৪২ দশমিক ৫৫ কোটি টাকার বিপরীতে বিতরণ হয়েছে ৩২২ দশমিক ২৬ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রেইজ প্রকল্পের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা গেলে বিদেশফেরত রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পুনর্বাসনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

প্রকল্পের মাধ্যমে উপকারভোগীদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে দেশ রূপান্তরের কথা হয়েছে। এদের একজন সুনামগঞ্জের হায়দারপুর গ্রামের আয়শা বেগম। অভাব দূর করতে উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে সৌদি আরব যান। সেখানে নির্যাতনের শিকার হলেও হাল ছাড়েননি। দেশে ফিরে দিশেহারা অবস্থায় জেলা প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের মাধ্যমে রেইজ প্রকল্পে নিবন্ধন করেন। পরে তিনি হাঁস পালনের প্রশিক্ষণ, ১৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রণোদনা ও ৫ হাজার টাকা প্রশিক্ষণ ভাতা পান। নিজের সঞ্চয়ের সঙ্গে সেই অর্থ যোগ করে ২০০ হাঁসের বাচ্চা নিয়ে খামার শুরু করেন। বর্তমানে তার খামারে ৫০০-এর বেশি হাঁস রয়েছে। সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা, দুই মেয়েও স্কুলে যাচ্ছে। আয়শা বলেন, ‘রেইজ প্রকল্পের কাউন্সেলিং ও আর্থিক সহযোগিতা আমার জীবন বদলে দিয়েছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসুদেব গ্রামের নাইমা হাসানও একইভাবে নতুন জীবন শুরু করেছেন। বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে নামতে হয় তাকে। দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে গিয়ে হাসপাতালে হাউজকিপিংয়ের কাজ করলেও দেশে ফিরে আর্থিক সংকটে পড়ে যান। পরে স্থানীয় প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের মাধ্যমে রেইজ প্রকল্পে যুক্ত হয়ে বিসিকের অধীনে ফুড প্রসেসিং প্রশিক্ষণ নেন। প্রকল্প থেকে প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ ভাতা পেয়ে বাসায় কেক তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তার মাসিক আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। নাইমা বলেন, ‘সঠিক দিকনির্দেশনা আর সামান্য সহায়তা পেলে একজন মানুষ আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে।’

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার রাকিব মিয়াও রেইজ প্রকল্পের সহায়তায় স্বাবলম্বী হয়েছেন। তুরস্ক থেকে ফিরে হতাশায় ডুবে থাকা রাকিব স্থানীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রকল্প সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে ১৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রণোদনা পেয়ে বাঁশের তৈরি কুটিরশিল্প পণ্য উৎপাদন শুরু করেন। বর্তমানে দুজন কর্মচারী নিয়ে তার ছোট ব্যবসা চলছে এবং মাসে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা আয় করছেন। এ ছাড়া পাবনার জাকেয়ার গরু-ছাগলের খামার, সুনামগঞ্জের মাহবুবুর রহমানের মোবাইল সার্ভিসিং দোকান, চট্টগ্রামের চন্দন মল্লিকের ‘স্বপ্ন মডেল ফার্মেসি’, নরসিংদীর কাউসার মিয়ার ওয়েল্ডিং দোকান কিংবা যশোরের নাসিমা আক্তারের অর্গানিক সাবান ব্যবসার মতো উদ্যোগ এখন বিদেশফেরত কর্মীদের নতুন স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কভিড মহামারীর সময় থেকে বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে রেইজ প্রকল্প। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের স্বপ্ন পূরণে রাষ্ট্রের এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়।’

প্রকল্প পরিচালক ড. এটিএম মাহবুব-উল করিম বলেন, ‘বিদেশ ফেরত কর্মীদের আমরা বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে চাই। তাদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখা সম্ভব।’