নতুন বছরের শুরুতে ঝুঁকি কাটিয়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করছে, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক বছরে ব্যাংকটির সার্বিক কার্যক্রম ঢেলে সাজানোর ফলে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। সিস্টেম আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আরও নিরাপদ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং গ্রামীণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও। ফলে দেশের অন্যতম প্রধান ইসলামি ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
জানা গেছে, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকের আমানত সুরক্ষার লক্ষ্যে ১২টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিযুক্ত করা হয় স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে আছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে কিছু নেতিবাচক চিত্র। সরকারের তদারক সংস্থার পক্ষ থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ একাধিক সংস্থার অডিটে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক থেকে বড় ধরনের আর্থিক লুটপাটের প্রমাণ মেলেনি। ফলে ব্যাংকটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।
গত বছর শেষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে দেখা গেছে, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের আমানত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। এর অগের বছর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আমানত ছিল ৫১ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। সংকটময় পরিস্থিতি বিবেচনায় গত বছর আমানত কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলেও কার্যত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আমানত বেড়েছে। একইভাবে গ্রাহক বা ব্যাংক হিসাব সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমানত অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪৭টি। এর আগের বছর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আমানত হিসাব সংখ্যা ছিল ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার ২৪০টি। এক বছরের ব্যবধানে অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে ২ লাখ ২৯ হাজারের বেশি।
২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, যেখানে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৪৮ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা।
ব্যাংকটির সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ৪ মাসে পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৮৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ১ লাখ ৮০ হাজার অ্যাকাউন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এপ্রিল মাস শেষে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের আমানত হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখ ৪৫ হাজার। এ সময়ে বৈদেশিক বাণিজ্য হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকের ডিপোজিট ও বিনিয়োগ স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক কখনোই তারল্য সংকটে পড়েনি। ফলে অন্যান্য বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোর মতো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের। কঠিন সময়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এ দক্ষতার বিষয়টি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় বছরে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের পথ সুগম হয়েছে। এতে শুরুতে কিছুটা ধকলের মুখোমুখি হলেও এখন সুফল আসতে শুরু করেছে। চলতি বছরের শুরুতেই ব্যাংকের সিস্টেম আপগ্রেডেশন করা হয়েছে। আধুনিক এ কোর ব্যাংকিং সিস্টেম ‘আবাবিল এনজি’ চালুর ফলে লেনদেন এখন আরও নিরাপদ, দ্রুত, নিরবচ্ছিন ও স্থিতিশীল হয়েছে। এতে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং, এটিএম, বিএফটিএন, আরটিজিএস ও এনপিএসবি সেবার কার্যকরিতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ব্যাংকটি ভবিষ্যৎমুখী ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণে আধুনিক ও স্মার্ট যুগে প্রবেশ করেছে।
এ ছাড়া সারা বাংলাদেশের ৩০৬টি উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা ৭৩৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। গত ১৬ মাসে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার। মোট আমানতের পরিমাণ ৪ হাজার ৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শতকরা ৮৮ ভাগ আউটলেট গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। যার গ্রাহক ৪৯ ভাগ নারী।
এদিকে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের লক্ষ্যে আল-আরাফাহ্ রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এআরডিপি) আওতায় ২ হাজার ৭৮০টি গ্রামে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এ কর্মসূচির সদস্য সংখ্যা ৮৬ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ৭২ শতাংশ নারী। এর আওতায় গত ১৬ মাসে প্রায় ৩০ হাজার হিসাব সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে এখন মোট হিসাব সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজার ৯০০টিতে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ে আমানত বেড়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। বর্তমানে এই প্রকল্পের আমানত ৭৫০ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ ৫৪১ কোটি টাকা।
একই সময়ে দেশের অন্যতম সমন্বিত শরিয়াহসম্মত ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। এর মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ইসলামিক ওয়ালেট, বাংলা কিউআর, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং এআরডিপিকে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। এতে সঞ্চয়, দান, শিক্ষা ও বিনিয়োগ ক্যাশলেস করা সম্ভব হচ্ছে। এটিও একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে ২২৬টি শাখা, ৮৯টি উপশাখা ও ৭৩৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে আধুনিক গ্রাহকসেবা প্রদান করছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক।
ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাফাত উল্লাহ খান বলেন, আস্থা হারানো সহজ, কিন্তু ফিরে পাওয়া কঠিন। সেই কঠিন পথটাই ধীরে ধীরে অতিক্রম করছে আল-আরাফাহ, ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। নানা চ্যালেঞ্জ, অস্থিরতা ও গুজবের মধ্যেও ব্যাংকটি গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে, এটাই সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক।
ডিজিটাল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমে অগ্রগতি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ ও নির্ভরযোগ্য করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আশাব্যঞ্জক।