মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্প ভ্যাকসিনের একাধিক হস্তান্তর অনুষ্ঠান

দুই বছর আগেই শেষ হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। তবে থেমে যাননি প্রকল্প পরিচালক। মেয়াদ পূর্তির পরও উদ্ভাবিত টিকার (ভ্যাক্সিন) ভেলিডেশন (কার্যকারিতা যাচাই) ও হস্তান্তরে কাজ করছেন তিনি। একই সময়ে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের ভ্যালিডেশন ও হস্তান্তরের জন্য আয়োজন করছেন আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে সমালোচনা ও বিশ্লেষণ। এমন ঘটনা ঘটেছে, আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগ ও জুনোসিস গবেষণা প্রকল্পে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) সূত্রে জানা গেছে, আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগ ও জুনোসিস গবেষণা প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জুনে সমাপ্ত হয়েছে। এর আওতায় মোট সাতটি টিকা বীজ বা ভ্যাকসিন তৈরির লক্ষ ছিল। তবে প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক ও বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ আবদুস সামাদ জানান, লাম্ফি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি), মুরগির বার্ড ফ্লু প্রতিরোধের জন্য এইচ৯ এন ২, গোট পক্স এবং মাল্টিভেলেন্ট সালমোনেলাসহ মোট চারটি ভ্যাকসিন তৈরি করতে পেরেছেন।

জানা গেছে, এর মধ্যে এলএসডি ও এইচ৯ এন ২ দুটির ভ্যালিডেশন একসঙ্গে শেষ হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুধুমাত্র প্রথমটি হস্তান্তর করা হয়েছে। ২০২৫ সালে রাজধানীর এক পাঁচতারকা হোটেলে তখনকার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের কাছে ভ্যাকসিনটি হস্তান্তর করা হয়। আর এইচ৯ এন ২ ভ্যাকসিনটি হস্তান্তর করা হয়নি। তবে, এখন নতুন করে ভ্যাকসিনটি হস্তান্তরের তোড়জোড় শুরু করেছেন সাবেক প্রকল্প পরিচালক।

সূত্র বলছে, গোট পক্স ভ্যাকসিনের ভ্যালিডেশনের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে এবং মাল্টিভেলেন্ট সালমোনেলার ভ্যালিডেশন পরের ধাপে করা হবে।

বার্ড ফ্লুর টিকার হস্তান্তর কেন একইসময়ে করা হয়নি জানতে চাইলে আবদুস সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দুটি নতুন ভ্যাকসিন একইসঙ্গে উৎপাদনে নেওয়ার সুযোগ সীমিত। একটি ভ্যাকসিন লাইন চালু করতে চার থেকে ছয় মাস সময় লাগে। যে কারণে একসঙ্গে দেওয়া হয়নি।

প্রকল্প মেয়াদ শেষে কেন তৃতীয় ও চতুর্থ ভ্যাক্সিনের ভ্যালিডেশনের কাজ করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি হঠাৎ করেই সে সময় বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় ৭৮ শতাংশ অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। এখন এসব কাজ নিয়ম মেনেই বিএলআইয়ের গবেষণা তহবিল থেকে খরচ করা হচ্ছে।

তবে বিএলআরআইয়ের গবেষকদের অভিযোগ, এটা মূলত লোক দেখানো একটি কাজ। সরকারের নতুন মন্ত্রী ও পদস্থদের কাজ দেখিয়ে ব্যক্তি সুবিধা আদায়ের প্রক্রিয়া। এ কারণে ভ্যাকসিনগুলো একসঙ্গে হস্তান্তর করা হয়নি। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর একই কাজ দ্বিতীয়বার করায় যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়। নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ভ্যাকসিন বুঝিয়ে দেওয়া যায়। সেটি না করে বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় দুটি ভ্যাকসিনের ফিল্ড ট্রায়াল ও ভ্যালিডেশন পুনরায় সম্পন্ন করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে ‘গোট পক্স’ ভ্যাকসিনের সিড ভ্যালিডেশন কমিটি ২০২৪ সালের ৬ মে গঠন করে কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় কেন আবার ফিল্ড ট্রায়াল ও ভ্যালিডেশনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে আগের গবেষণা ও ভ্যালিডেশন কার্যক্রম কি কার্যকর ছিল না, নাকি একই কার্যক্রম পুনরায় দেখিয়ে নতুন করে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে?

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী স ম রেজাউল করিম এবং বিএলআরআই’র সাবেক মহাপরিচালকদের প্রভাবিত করে ড. সামাদ প্রশাসনিক, গবেষণা, প্রকল্প পরিচালনা ও সমন্বয়সহ একসঙ্গে প্রায় ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগবিধি উপেক্ষা করে তিনি একই সময়ে ‘আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগ ও জুনোসিস গবেষণা প্রকল্প (২০১৯-২০২৪)’ এবং জিএইএসএ প্রকল্পের (২০১৭-২০২১)’ -পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি প্রাণিস্বাস্থ্য গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান (অতিরিক্ত দায়িত্ব), ট্রান্সবাউন্ডারি অ্যানিম্যাল ডিজিজ সেন্টারের দপ্তর প্রধান, ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি ফর এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার ডিরেক্টর ইনচার্জ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যাকশন সেন্টারের ইনচার্জ, ওয়ান হেলথ পোল্ট্রি হাবের সমন্বয়ক এবং একাধিক আন্তর্জাতিক প্রকল্পের প্রধান গবেষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বিএলআরআই’র বিজ্ঞানীদের অভিযোগ, এত বিপুল দায়িত্ব এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় প্রাণিস্বাস্থ্য বিভাগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগ্য ও মেধাবী গবেষকদের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।