দেশে প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষ দৈনিক গড়ে প্রায় ৯ গ্রাম লবণ গ্রহণ করেন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশকৃত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। এই অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার কারণে প্রতিবছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনকারী এবং নীতিনির্ধারণী নিয়ন্ত্রক সংস্থার যৌথ উদ্যোগে গ্রহণ না থাকলে হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়তেই থাকবে।
গতকাল বুধবার ‘বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) উদ্যোগে এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় আয়োজিত এক জনসচেতনতামূলক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরেন বক্তারা। বিএফএসএ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ফারুক আহম্মেদ।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের সহকারী বিজ্ঞানী ডা. আহমাদ খাইরুল আববার। এতে বলা হয় দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। এর মধ্যে ৫১ শতাংশ মানুষ অকালে মারা যান। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ ও পাকস্থলির ক্যানসারের মতো নানা জীবনঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। দেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিয়ন্ত্রণে থাকে না। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।
ডব্লিউএইচওর প্রোগ্রাম অফিসার (ডায়েট রিলেটেড রিস্ক ফ্যাক্টর) সামিনা ইসরাত বলেন, বাংলাদেশে ‘ফ্রন্ট-অব-প্যাক’ লেবেলিং চালু করা খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কৌশল। প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য পুষ্টি তথ্য প্রদান করলে ভোক্তাদের আরও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচন করতে সহায়তা করবে।
আলোচনায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারে থাকা ‘লুকায়িত লবণ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ, বিস্কুটসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় খাদ্যে উচ্চমাত্রার লবণ থাকে। এমনকি অনেক মিষ্টি স্বাদের খাবারেও অতিরিক্ত সোডিয়াম বিদ্যমান, যা অধিকাংশ ভোক্তার অজানা। ফলে মানুষ অজান্তেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করছেন। এ জন্য উচ্চ লবণযুক্ত খাবার সহজে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে বাধ্যতামূলক প্যাকেটের সামনে সতর্কতামূলক লেবেলিং ব্যবস্থা চালু; প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রস্তুত প্রণালির পুনর্গঠন ও শিক্ষামূলক প্রচারণার মতো কার্যকর কৌশলগুলো বাস্তবায়ন জরুরি।
ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ফারুক আহম্মেদ বলেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ বর্তমানে একটি নীরব জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। খাদ্যে অতিরিক্ত লবণের ব্যবহার মানুষের অজান্তেই উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাদ্যে অতিরিক্ত লবণের উপস্থিতি ভোক্তাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে খাদ্যের মোড়কে সঠিক পুষ্টি তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
বিএফএসের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, লবণ গ্রহণ কমাতে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে লবণের পরিমাণ কমিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।