৭ বিশ্বকাপের রোমাঞ্চে ফাহিমা

১৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, এর মধ্যেই খেলে ফেলেছেন ছয়টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ফাহিমা খাতুন এবার খেলতে যাচ্ছেন টানা সপ্তম বিশ্বকাপ। ছোট সংস্করণের বিশ্ব আসরে প্রতিবারই বাংলাদেশের সঙ্গী হওয়া স্পিনিং এ অলরাউন্ডার এবার একটু বেশিই রোমাঞ্চিত। বিশ্বকাপ এলেই বিশেষ কিছু করার চেষ্টায় থাকা ফাহিমা এবার এমন কিছু করতে চান, যা বাংলাদেশ দলে আগে কেউ করেননি। এ জন্য ‘সিক্রেট রেসিপি’ প্রস্তুত করছেন ৩৩ বছর বয়সী এ ক্রিকেটার।

 ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেয় বাংলাদেশ। ঘরের মাঠের সেই বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে পরের সবকটি আসরে বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন ফাহিমা খাতুন। বিশ্বকাপ মিশনে আরও একবার দলের অংশ হয়ে উচ্ছ্বসিত অভিজ্ঞ এ ক্রিকেটার টানা সপ্তম বিশ্বকাপ খেলা তার কাছে রীতিমতো ‘ভাগ্যের ব্যাপার’। আগামী ১২ জুন ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের পরিকল্পনা, শততম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ, দলের সম্ভাবনাসহ অনেক কিছু নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এ লেগ স্পিনার।

টানা সপ্তম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার রোমাঞ্চের কথা জানাতে গিয়ে সবার আগে পরিবারের কথা মনে করলেন ফাহিমা খাতুন। বললেন, ‘ভালো লাগা অবশ্যই কাজ করে। আমার পরিবার খুব সাপোর্টিভ। তারা যখন এ বিষয়টি দেখে বা শোনে, তারা গর্বিত হয়, আমাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করে। ওই ভালো লাগাটা খুব কাজ করে। বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রিকেটার হিসেবে সাতটি বিশ্বকাপ খেলা, এটি আমার জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। অনেক ভালো লাগার।’

এবারের বিশ্বকাপ ফাহিমার কাছে বিশেষ, তাই পরিকল্পনাও বিশেষ রকমের। অতীতে বিশ্বকাপের আগে নিজের পরিকল্পনা বা লক্ষ্যের কথা জানালেও এবার কিছুই বলতে চান না, ‘যে ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছি, প্রতিটিই আমার কাছে স্পেশাল। লক্ষ্য থাকলে আমি শেয়ার করি। কিন্তু এবারেরটা সিক্রেট থাক। দেখি নতুন কিছু করা যায় কিনা, যেটা আগে কখনো হয়নি। বিশ্বকাপ নিয়ে আমার ওই ধরনের চিন্তা আছে। স্পেশাল যদি কিছু করার সুযোগ থাকে, অবশ্যই সেটা দলের জন্য করব’, বলেন ফাহিমা।

বাংলাদেশের হয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২৪টি ম্যাচ খেলা ফাহিমা বল হাতে নিয়েছেন ১৪ উইকেট, ৯.০৫ গড়ে রান করেছেন ১১৪। ঝলমলে পারফরম্যান্স করতে না পারার অতৃপ্তি আছে তার, সঙ্গে উল্লেখ করেন ব্যাটিং পজিশনের কথাও। ফাহিমা বলেন, ‘আমার পারফরম্যান্স আরও ভালো হতে পারত। আমি বেশিরভাগ সময় লোয়ার অর্ডারে ব্যাটিং করি। মিডল অর্ডার বা একটু উপরে ব্যাটিং করার সুযোগ হলে আমার ইনিংসগুলো আরেকটু বড় হতে পারত। তবে যখনই সুযোগ পাব, আমি চেষ্টা করব দলে জন্য অবদান রাখার। ৫০ বা ১০০ না হয়ে যদি আমার ২৫-৩০ রানও দলের কাজে লাগে, এমন লক্ষ্য আমার থাকে।’

বাংলাদেশ দলে ফাহিমার পরিচয় স্পিনিং অলরাউন্ডার। অথচ জাতীয় দলে তার শুরুটা হয় ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবে, করতেন পেস বোলিং। দলে জায়গা পোক্ত করতে নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলা ফাহিমা সেই গল্প শোনালেন, ‘আমি বাংলাদেশ দলে ব্যাটার হিসেবে ঢুকেছি, ওপেনার ছিলাম। পেস বোলিং করতাম। পেস বোলিং অলরাউন্ডার বা ব্যাটিং অলরাউন্ডার বলতে পারেন। সেই সময় আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশ দলে অবস্থান তৈরি করতে ভিন্ন চিন্তা করতে হবে। তখন থেকে লেগ স্পিন করা। মজার ছলেই করা, কিন্তু এরপর পেশাদার লেগ স্পিনার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি।’

ফাহিমার বয়স ৩৩, কিন্তু দলের অনেকের কাছে এখনো তিনি তারুণ্যের প্রতীক। বাংলাদেশ নারী দলের গুরুত্বপূর্ণ এ সদস্যও বয়সকে শুধুই সংখ্যা মনে করেন। ফিট থেকে জাতীয় দলে দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে ফাহিমা বলেন, ‘শৃঙ্খলা মেনে সবসময় ফিট থাকার চেষ্টা করি। দলের প্রায় সবাই ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকে আমাকে। কেউ প্রফেসর বলে, কেউ আবার আমাকে আয়ুর্বেদিক বলে ডাকে। কারণ আমার খাদ্যাভ্যাস অনেক ভালো। তেলযুক্ত খাবার খাই না, অনেক খাবার এড়িয়ে চলি। আমি লাকি যে এই ক্ষেত্রেও আমার পরিবার পুরো সমর্থন দেয়, আর আমার চেষ্টা তো থাকেই। এ ছাড়া মনীষীরা তো বলেই গেছেন বয়স শুধুই সংখ্যা।’

বাংলাদেশের পক্ষে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৯৯টি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন ফাহিমা। বিশ্বকাপে নিজের শততম ম্যাচটি খেলবেন তিনি। টানা সপ্তম বিশ্বকাপ খেলার রোমাঞ্চ তো আছেই, সঙ্গে মাইলফলকের ম্যাচ। ছিপছিপে গড়নের ফাহিমা দারুণ পারফরম্যান্সে শততম ম্যাচটি রাঙাতে চান, দলের জয়ে অবদান রেখে হাসতে চান বিজয়ের হাসি।

বাংলাদেশ থেকে টানা ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা একমাত্র ক্রিকেটার ফাহিমা হলেও টানা পাঁচ বিশ্বকাপ খেলা অনেকেই আছেন। নিগার সুলতানা জ্যোতি, রুমানা আহমেদ, ফারজানা আহমেদ, সালমা খাতুন, জাহানারা আলম, নাহিদা আক্তার, রিতু মনিরা টানা পাঁচটি করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেছেন। বাংলাদেশ পুরুষ দলে সবচেয়ে বেশি টানা ৯টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেছেন সাকিব আল হাসান। সর্বশেষ আসরে খেলেনি বাংলাদেশ, এর আগের সবকটি আসরে বাংলাদেশ দলে ছিলেন সাকিব। টানা সাতটি করে বিশ্বকাপ খেলেছেন মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। বর্তমান বিসিবিপ্রধান তামিম ইকবাল ২০০৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত টানা ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন।