আমেরিকার প্রতিরক্ষা কৌশল, নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও বাংলাদেশের অবস্থান

পৃথিবী আজ এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালের মে মাসে, যখন পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের উপর গভীর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া ঘনিয়ে উঠেছে, যখন ইরানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে অসমমিত যুদ্ধের ধোঁয়া এখনও সম্পূর্ণ মিলিয়ে যায়নি, তখন বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ এবং সাধারণ মানুষ একই প্রশ্ন করছেন — এ কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম অধ্যায়ের সূচনা, নাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর একক আধিপত্যের যুগের চূড়ান্ত অবসান এবং এক নতুন বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার জন্ম?

চীনা ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক যিনি প্রফেসর জিয়াং হিসেবে খ্যাত, যিনি ‘Predictive History’ চ্যানেল এবং সাবস্ট্যাকে ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, গেম থিওরি ও দার্শনিক চিন্তার সমন্বয়ে কাজ করেন, ২০২৪ সালেই তিনটি বড় ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। প্রথমত, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয়; দ্বিতীয়ত, আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ; এবং তৃতীয়ত, এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকার কৌশলগত ক্ষতি যা বিশ্বব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে পুনর্গঠিত করবে। প্রথম দুটি ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথ অভিযান শুরু করে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই নিহত হন, দেশটির নিউক্লিয়ার স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান এড়িয়ে যাওয়া হয়। ইরান তার দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি — পাহাড়ি দুর্গ, ভূগর্ভস্থ সুবিধা, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং হুথি, হিজবুল্লাহ, হামাসসহ বিস্তৃত প্রক্সি নেটওয়ার্ক — দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অসমমিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়, কিন্তু মে মাসেও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ আটক, আংশিক ব্লকেড এবং সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।

প্রফেসর জিয়াং ইরানকে ‘মাউন্টেন ফর্ট্রেস’ হিসেবে বর্ণনা করে যে কথা বলেছিলেন, তা পুরোপুরি সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা, জনসংখ্যাগত গভীরতা, আদর্শিক প্রতিরোধশক্তি এবং অসমমিত যুদ্ধকৌশল দ্রুত বিজয়কে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল চোকপয়েন্ট। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং উল্লেখযোগ্য এলএনজি এই সরু পথ দিয়ে পরিবহন হয়। এখানে যেকোনো বিঘ্ন তেলের দাম বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী শক্তি সংকট, সার উৎপাদন ব্যাহত, খাদ্য মূল্য বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ঘটায়। বাস্তবে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা চীন ও রাশিয়াকে সুবিধা দিয়েছে। তারা ইরানি তেল সস্তায় কিনতে পারছে এবং রাশিয়ার তেল রপ্তানির দামও বেড়েছে। এই পরিস্থিতি প্রফেসর জিয়াং-এর ‘গ্লোবাল ইকোনমি ব্রেক’ থিসিসকে পুরোপুরি সমর্থন করে।

এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যারা তাঁকে উন্মাদ, অপ্রত্যাশিত এবং অস্থিরচিত্ত বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাঁরা এখন তাঁর কৌশলগত দূরদর্শিতা ও বাস্তববাদ দেখে অবাক হচ্ছেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের কৌশল ইতিহাসের গভীর পাঠ, বাস্তববাদী হিসাব-নিকাশ এবং আমেরিকান সাম্রাজ্যের পুনর্গঠনের স্পষ্ট ছাপ বহন করে। 

ট্রাম্পের এই কৌশলকে পুরোপুরি বুঝতে হলে ২০২৬ সালের ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল’ (NDS) দলিলের গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। ৩৪ পৃষ্ঠার এই দলিলটি মূলত আমেরিকান সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের এক নীল নকশা। এখানে ‘Department of War’ পরিভাষাটি ব্যবহারের মাধ্যমে আমেরিকা তার সামরিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এক আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই দলিলে চারটি মূল স্তম্ভ বা ‘লাইন অফ এফর্ট’ স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে: প্রথমত, সমগ্র পশ্চিম গোলার্ধকে ‘বর্ধিত মাতৃভূমি’ হিসেবে বিবেচনা করে পানামা খাল ও গ্রিনল্যান্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা; দ্বিতীয়ত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ‘Denial Defense’ কৌশলের মাধ্যমে চীনের বিস্তার রোধ; তৃতীয়ত, ন্যাটোভুক্ত মিত্রদের ওপর ৫ শতাংশ জিডিপি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে নিজের আর্থিক দায় কমানো; এবং চতুর্থত, এআই ও রি-শোরিংয়ের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পকে ঢেলে সাজানো। এই কৌশল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুইশ বছরের ‘চোকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ’ নীতিরই একটি আধুনিক আমেরিকান সংস্করণ। পানামা খাল, আমেরিকার উপসাগর এবং গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করা হয়েছে। এটি মনরো মতবাদের আধুনিক সংস্করণ। ট্রাম্প চান পিছনের ঘাঁটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রেখে দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে নির্বাচিত, সীমিত এবং কার্যকর শক্তি প্রয়োগ করতে। ন্যাটোতে পাঁচ শতাংশ জিডিপি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রস্তাব মিত্রদের বোঝা বাড়ানোর স্পষ্ট উদাহরণ।

ট্রাম্পের এই কৌশল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুইশ বছরের ঐতিহ্যের একটি আধুনিক আমেরিকান সংস্করণ। ব্রিটেন যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ, বিভাজন ও শাসননীতি এবং মিত্রদের বুদ্ধিমান ব্যবহার করে বিশ্ব শাসন করেছিল, ট্রাম্পও অনুরূপভাবে হরমুজ, পানামা, মালাক্কাসহ বিভিন্ন চোকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করে, মিত্রদের উপর বোঝা চাপিয়ে এবং শাসন পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘সমকক্ষদের মধ্যে প্রথম’ অবস্থান ধরে রাখতে চান। ইরান যুদ্ধে পূর্ণ স্থল আক্রমণ না করে নৌবহর, বিমান এবং প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ এই কৌশলের প্রমাণ। ফলে আমেরিকার আপেক্ষিক পতন ঘটছে বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ ধ্বংস নয় — বরং একটি স্মার্ট পুনর্গঠন (repositioning) চলছে। এটি ট্রাম্পের প্রথম লক্ষ্য ও কৌশল।

দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে শক্তির ভিত্তিতে নিরুৎসাহিত করা, কিন্তু সরাসরি বড় যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া। এখানে ‘denial defense’ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, বিশেষ করে প্রথম দ্বীপশ্রেণীতে (First Island Chain)। তৃতীয় লক্ষ্য হলো মিত্রদের উপর প্রতিরক্ষার বোঝা বৃদ্ধি করা। ন্যাটোর ক্ষেত্রে পাঁচ শতাংশ জিডিপি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রস্তাব এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। ইউরোপকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রধান দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে। চতুর্থত, আমেরিকার প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তিকে অত্যন্ত দ্রুত শক্তিশালী করে তোলা, যার মধ্যে রি-শোরিং, এআই ইন্টিগ্রেশন এবং মিত্রদের উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত।
এই দলিলে ‘Department of War’ নামের ব্যবহার লক্ষণীয়। এটি শুধু নামের পরিবর্তন নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আমেরিকা এখন আর শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়, সক্রিয় ও নির্ধারক ভূমিকা নিতে প্রস্তুত। ট্রাম্পের এই কৌশল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুইশ বছরের ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। ব্রিটিশরা বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করে, স্থানীয় মিত্রদের ব্যবহার করে এবং ‘divide and rule’ নীতি প্রয়োগ করে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছিল। ট্রাম্পও হরমুজ, পানামা, মালাক্কা এবং তাইওয়ান প্রণালীর মতো চোকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একই কাজ করতে চান। পার্থক্য শুধু এই যে, ব্রিটিশরা সাম্রাজ্যবাদের স্বর্ণযুগে এটি করেছিল, আর ট্রাম্প করছেন বহুমেরু বিশ্বের প্রথম পর্যায়ে।

এই কৌশলের মধ্যে ধর্মীয় এসক্যাটোলজির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইসরায়েলের জন্য ইরান যুদ্ধ শুধু নিরাপত্তা বা আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই নয়। এটি বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অনেক ইহুদি ধর্মতাত্ত্বিক বৃহত্তর ইসরায়েলের ধারণা এবং মন্দির পাহাড়ের পুনর্নির্মাণকে মশীহের আগমনের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখেন। ইরানকে দুর্বল করার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এই দীর্ঘমেয়াদি ধর্মীয়-রাজনৈতিক লক্ষ্যের অংশ হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরান শিয়া ইসলামী এসক্যাটোলজিতে বিশ্বাস করে। তাদের মতে, মাহদির আগমনের পূর্বে বড় আকারের সংঘাত ও বিপ্লব ঘটবে। ইরানের পাহাড়ি আশ্রয়স্থল, ভূগর্ভস্থ শহর এবং প্রক্সি নেটওয়ার্ক এই দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দুই ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীর সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে আরও জটিল করে তুলেছে।

রাশিয়ার ক্ষেত্রে দার্শনিক আলেকজান্ডার দুগিনের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। তাঁর ‘চতুর্থ রাজনৈতিক তত্ত্ব’ উদারনীতি, কমিউনিজম ও ফ্যাসিজমের বাইরে এক নতুন পথ দেখায়। রাশিয়ার নেতৃত্বে অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্ম, ঐতিহ্যবাদ এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে এক ইউরেশিয়ান সাম্রাজ্য গড়ে তোলাই এই তত্ত্বের মূল কথা। রাশিয়া ইরানকে সমর্থন দিয়ে আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যে আটকে রাখছে, যাতে ইউক্রেনে নিজের লক্ষ্য (বিশেষ করে ওডেসা দখল) অর্জন করতে পারে। এই কৌশল দুগিনীয় দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ।

চীন এই সংঘাতে ধৈর্যশীল অবস্থান নিয়েছে। তারা হরমুজ সংকটে সস্তায় ইরানি তেল কিনছে, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করছে এবং ডলার-প্রভাবিত ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করছে। চীনের লক্ষ্য হলো ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

এই সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিশ্বব্যবস্থা একক মেরু থেকে বহুমেরুতে রূপান্তরিত হচ্ছে। আমেরিকা এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী একক দেশ, কিন্তু তার আধিপত্য আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। চীন, রাশিয়া, ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরবসহ মধ্যম শক্তিগুলো নতুন করে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।


.
এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত বহুমেরু রূপে রূপান্তরিত হচ্ছে। আমেরিকা এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী একক দেশ, কিন্তু তার আধিপত্য আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। চীন, রাশিয়া, ইরানের ক্রমবর্ধমান অক্ষ (CRI axis) একটি শক্তিশালী প্রতি-আধিপত্য তৈরি করছে। চীন এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়েনি, বরং ধৈর্যশীল কৌশল অবলম্বন করেছে। তারা হরমুজ সংকটের সুযোগ নিয়ে ইরান থেকে সস্তায় তেল কিনছে, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগকে আরও জোরদার করছে এবং ডলার-প্রভাবিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে petroyuan, BRICS পেমেন্ট সিস্টেম এবং CIPS-এর মতো নতুন কাঠামো গড়ে তুলছে। চীনের লক্ষ্য স্পষ্ট — ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে নিজের প্রভাব বলয় সম্প্রসারণ করা।

রাশিয়া এই সংঘাতকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে। আলেকজান্ডার দুগিনের চতুর্থ রাজনৈতিক তত্ত্ব অনুসারে রাশিয়া শুধু একটি দেশ নয়, বরং একটি সভ্যতা। অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্ম, ঐতিহ্যবাদ এবং ইউরেশিয়ান স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলাই তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। রাশিয়া ইরানকে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যে আটকে রাখছে, যাতে ইউক্রেনে নিজের লক্ষ্য (বিশেষ করে কৃষ্ণ সাগরের নিয়ন্ত্রণ এবং ওডেসা দখল) অর্জন করতে পারে। এই কৌশল দুগিনীয় দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ।

ভারত এই বহুমেরু খেলায় একটি স্মার্ট ভারসাম্য বজায় রাখছে। BRICS-এর মাধ্যমে চীন-রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করলেও কোয়াড (QUAD) এবং আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছে। ভারতের লক্ষ্য হলো চীনের উত্থানকে প্রতিহত করা এবং নিজেকে একটি স্বাধীন মহাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যম শক্তিগুলোও নতুন জোট গঠন করছে। তারা আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও চীনের বিনিয়োগ এবং রাশিয়ার অস্ত্র গ্রহণ করছে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো সম্পদের লড়াইয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং আমেরিকার নিরাপত্তা সহায়তার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। রাশিয়ার শক্তি সরবরাহে বিঘ্ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন তাদের দুর্বল করেছে। ফলে ইউরোপ এখন নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমেরিকার উপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে।

 

এই বহুমেরু বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান (বঙ্গোপসাগর), তরুণ জনশক্তি, আরএমজি খাত, রেমিট্যান্স এবং জলবায়ু ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশকে আর কোনো ছোট দেশ হিসেবে দেখা যায় না। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতি ঘোষণা করেছে। এই নীতির মূল কথা হলো — সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সমান ও মর্যাদার ভিত্তিতে, কিন্তু কোনো একক দেশের উপর অতিনির্ভরশীলতা এড়ানো।

বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে অবকাঠামো প্রকল্প (পদ্মা সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র) চালিয়ে যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে আরএমজি রপ্তানি বাজার টিকিয়ে রাখছে, ভারতের সঙ্গে পানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে এবং গাল্ফ দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমিক রপ্তানি ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। এটি আর শুধু নিরপেক্ষতা নয়, বরং সক্রিয় কৌশলগত বহুমুখিতা (Strategic Multi-Alignment)।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভারত-চীন প্রতিযোগিতায় "ফুটবল" হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি, ঋণের জালে পড়ার সম্ভাবনা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভূত নিরাপত্তা হুমকি বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও সূক্ষ্ম করে তুলেছে।

এই বহুমেরু বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন আর প্রান্তিক নয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গৃহীত "বাংলাদেশ ফার্স্ট" নীতি মূলত একটি সক্রিয় ‘কৌশলগত বহুমুখিতা’ (Strategic Multi-Alignment)। এটি কেবল গতানুগতিক নিরপেক্ষতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শক্তির সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখা। একদিকে চীনের বিনিয়োগ ও অবকাঠামো, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিশাল বাজার—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ, পানি সমস্যা সমাধান, প্রতিবেশী‌সুলভ আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন  এবং গাল্ফ দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমিক রপ্তানি ও জ্বালানি সহযোগিতাসহ সবকিছুকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে পরিচালনা করতে হবে। এই কৌশলের সফল বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক কূটনীতি, জলবায়ু নেতৃত্ব এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের কৌশলের প্রথম স্তম্ভ হলো অর্থনৈতিক কূটনীতি। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি আরএমজি খাত, রেমিট্যান্স এবং কৃষি। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজার ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় অবকাঠামো প্রকল্প চালিয়ে যাওয়া, কিন্তু ঋণের শর্তাবলি, জাতীয় স্বার্থ এবং পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করেই এগুতে হবে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের সঙ্গেও বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সাহসী, সময়োপযোগী ও দেশরক্ষাকারী সিদ্ধান্ত হবে আমেরিকার এই অসীম অসম ও ঐতিহাসিক গোলামীর চুক্তি থেকে বের হয়ে এসে দেশকে রক্ষা করা।

দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো জলবায়ু কূটনীতি। বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল, সবুজ প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জলবায়ু অর্থায়নের দাবিতে আন্তর্জাতিক ফোরামে নেতৃত্ব দিতে পারে। এটি শুধু অর্থ আনয়ন করবে না, বরং দেশের নরম শক্তি (soft power) এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করবে।

তৃতীয় স্তম্ভ হলো আঞ্চলিক সহযোগিতা। BIMSTEC, IORA এবং SAARC-এর পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন অপরিহার্য, কিন্তু চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে। 

চতুর্থ স্তম্ভ হলো অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি। বহুমেরু বিশ্বে টিকে থাকার জন্য অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। দুর্নীতি হ্রাস, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ (আরএমজির পাশাপাশি আইটি, ফার্মাসিউটিক্যালস, শিপবিল্ডিং, সবুজ শক্তি), খাদ্য ও শক্তি নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি — এগুলো ছাড়া বাইরের কোনো কূটনীতিই টেকসই হবে না।

আগামী পঞ্চাশ বছরের বিশ্ব চিত্র অত্যন্ত জটিল হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ চোকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করবে। ২০৪০ সালের দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং শক্তির বিপ্লব বিশ্বকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমির দেশগুলোতে বড় আকারের অভিবাসন, সম্পদের স্বল্পতা এবং নতুন ধরনের সংঘাত দেখা দিতে পারে। ২০৫০ থেকে ২০৭৫ সালের মধ্যে বিশ্ব আরও খণ্ডিত কিন্তু আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠবে। আমেরিকা selective hegemony বজায় রাখার চেষ্টা করবে, চীন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব নেবে, রাশিয়া তার ইউরেশিয়ান স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাবে এবং ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরবের মতো মধ্যম শক্তিগুলো নতুন সুযোগ লাভ করবে।

বাংলাদেশের জন্য এই সময়কাল ঝুঁকি ও সুযোগ দুটোই বয়ে আনবে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বড় শক্তিগুলোর চাপে পড়ে সার্বভৌমত্ব হারানো, ঋণের জালে আটকে পড়া, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু-উদ্ভূত নিরাপত্তা সংকট। অন্যদিকে সুযোগ রয়েছে তরুণ জনশক্তিকে দক্ষ করে বিশ্ববাজারে পাঠানো, সবুজ প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়া, আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং জলবায়ু কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জন।

সফল হতে হলে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ ঐক্য, দূরদর্শী নেতৃত্ব, স্বচ্ছ নীতি এবং জাতীয় স্বার্থের উপর অটল থাকতে হবে। “বাংলাদেশ ফার্স্ট” যদি শুধু স্লোগান না হয়ে সত্যিকারের জাতীয় নীতিতে পরিণত হয়, তাহলে এই ছোট দেশটি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সম্মানজনক ও প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

আগামী পঞ্চাশ বছরের বিশ্ব চিত্র অত্যন্ত জটিল, বহুমুখী এবং রূপান্তরকারী হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যবস্থায় চোকপয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং সাইবার ক্ষেত্রে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করবে। হরমুজ, পানামা, মালাক্কা এবং তাইওয়ান প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলো নিয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলবে। আমেরিকা তার নৌবহর এবং প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে এই চোকপয়েন্টগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবে, যেখানে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং নৌবহর সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিজস্ব প্রভাব বলয় তৈরি করবে।

২০৪০ সালের দিকে পৃথিবী প্রযুক্তির এককত্বের যুগে প্রবেশ করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), জৈবপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির বিপ্লব বিশ্ব অর্থনীতি, যুদ্ধকৌশল এবং দৈনন্দিন জীবনকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে। যে দেশ বা জোট এই প্রযুক্তিগত দৌড়ে এগিয়ে থাকবে, সেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। আমেরিকা তার প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সিলিকন ভ্যালির মাধ্যমে এআই ও কোয়ান্টাম ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করবে। চীন ইতিমধ্যে এআই, ৫জি/৬জি এবং সেমিকন্ডাক্টরে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। রাশিয়া হাইপারসনিক মিসাইল এবং সাইবার যুদ্ধে শক্তি দেখাবে।

জলবায়ু পরিবর্তন এই সময়কালের সবচেয়ে বড় গেম চেঞ্জার হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, খরা, বন্যা এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমির দেশগুলোকে ভয়াবহভাবে প্রভাবিত করবে। এর ফলে বড় আকারের অভিবাসন, সম্পদের স্বল্পতা, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং নতুন ধরনের আঞ্চলিক সংঘাত দেখা দিতে পারে। জলবায়ু শরণার্থী সংকট বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ তৈরি করবে।

২০৫০ থেকে ২০৭৫ সালের মধ্যে বিশ্ব আরও খণ্ডিত কিন্তু আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠবে। আমেরিকা selective hegemony বজায় রাখার চেষ্টা করবে, অর্থাৎ পুরো বিশ্বের পুলিশ না হয়ে নিজের মূল স্বার্থ (চোকপয়েন্ট, প্রযুক্তি, ডলার এবং পশ্চিম গোলার্ধ) রক্ষা করবে। চীন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব নেবে এবং নিজস্ব গণতান্ত্রিক মডেল প্রচার করবে। রাশিয়া তার ইউরেশিয়ান স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাবে। ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিলের মতো মধ্যম শক্তিগুলো আলগা জোট গঠন করে নতুন সুযোগ লাভ করবে। এই যুগকে ‘G0’ বা ‘নো হেজিমনি’ যুগ বলা যেতে পারে, যেখানে কোনো একক শক্তির পূর্ণ আধিপত্য থাকবে না।

বাংলাদেশের জন্য এই পঞ্চাশ বছর ঝুঁকি ও সুযোগের মিশ্রণ হবে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বড় শক্তিগুলোর চাপে পড়ে সার্বভৌমত্ব হারানো, ঋণের জাল, জলবায়ু-উদ্ভূত বড় আকারের অভিবাসন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। সুযোগ রয়েছে তরুণ জনশক্তিকে বিশ্বমানের দক্ষ করে তোলা, সবুজ প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়া, আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং জলবায়ু কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জন।

সফল হতে হলে বাংলাদেশকে পাঁচটি মূল ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হবে। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্য। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ অর্থাৎ আরএমজির পাশাপাশি আইটি, ফার্মা, সার্কুলার ইকোনমি এবং সবুজ শক্তির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে কৃষির আমূল পরিবর্তন ও উন্নয়ন। বাংলাদেশ কে বাঁচাতে হলে, স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে বাংলাদেশকে ফের কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তৃতীয়ত, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন। চতুর্থত, স্মার্ট কূটনীতি অর্থাৎ কোনো একক শক্তির উপর অতিনির্ভরশীলতা এড়িয়ে সবার সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পঞ্চমত, জলবায়ু অভিযোজন ও নেতৃত্ব সফলতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে যে যাই বলুক খাল খনন, নদীগুলোর ড্রেজিং ও নাব্যতা বৃদ্ধির যা যা করণীয়, তা সবই করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সরকারকে দল-মতের উর্ধ্বে উঠে দেশের সকল আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান ও‌ মিমাংসা করতে হবে। জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে সকল রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক ভুল বোঝাবুঝির মিমাংসা সহ ঐকমত্যের ভিত্তিতে সকল বিরোধ মিটিয়ে একটি স্থায়ী, চিরকালীন এবং অবশ্যপালনীয় ঐতিহাসিক ক্যালেন্ডার তৈরি করতে হবে। আর তাহলেই 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। আর যে সরকারপ্রধান এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন, ইতিহাসে তিনি মহানায়ক হিসেবে বিবেচিত হবেন।

যদি বাংলাদেশ এই পথে এগোয়, তাহলে ২০৭৫ সাল নাগাদ এই ছোট দেশটি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সম্মানজনক, আত্মনির্ভরশীল এবং প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে। অন্যথায় বড় শক্তিগুলোর খেলার পুতুলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
.
পরিশেষে বলা যায়, বহুমেরু বিশ্বের এই সন্ধিক্ষণে আমরা এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। জিয়াং-এর ভবিষ্যদ্বাণী, ট্রাম্পের কৌশলগত পুনর্গঠন, হরমুজ প্রণালীর আগুন, ধর্মীয় এসক্যাটোলজির গভীর প্রভাব এবং বাংলাদেশের মতো মধ্যম শক্তির স্বাধীন কৌশল -সবকিছু মিলিয়ে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হচ্ছে। একক আধিপত্যের যুগ শেষ হয়ে আসছে। তার জায়গায় আসছে এক জটিল, বহুমুখী এবং প্রতিযোগিতামূলক বহুমেরু বাস্তবতা, যেখানে কোনো একক শক্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, বরং আলগা জোট, ক্রমাগত আলোচনা এবং মধ্যম শক্তিগুলোর উত্থান নতুন স্থিতিশীলতা তৈরি করবে।

ট্রাম্পের কৌশল দেখিয়েছে যে আমেরিকা এখনও পরাজিত হয়নি, বরং স্মার্টভাবে নিজেকে পুনর্গঠিত করছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল দলিলে মাতৃভূমির প্রতিরক্ষা, চীনকে নিয়ন্ত্রণ, মিত্রদের বোঝা বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের পুনরুজ্জীবন -এই চারটি স্তম্ভের মাধ্যমে তারা আপেক্ষিক পতনকে সামলিয়ে ‘সমকক্ষদের মধ্যে প্রথম’ অবস্থান ধরে রাখতে চায়। হরমুজ প্রণালীর সংকট দেখিয়েছে যে ভবিষ্যতের যুদ্ধ আর শুধু স্থল বা আকাশে নয়, বরং শক্তি, বাণিজ্যপথ এবং অর্থনৈতিক চোকপয়েন্টের উপর নির্ভর করবে।

ধর্মীয় এসক্যাটোলজি এই সংঘাতকে আরও গভীর মাত্রা দিয়েছে। ইসরায়েলের বাইবেলীয় স্বপ্ন, ইরানের মাহদি সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী এবং রাশিয়ার দুগিনীয় ইউরেশিয়ান-খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের ধারণা — এগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে যে আধুনিক ভূ-রাজনীতি এখনও ধর্ম ও সভ্যতার সংঘাত থেকে মুক্ত নয়। হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব এখানে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের জন্য এই যুগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। "বাংলাদেশ ফার্স্ট"-নীতির আওতায় কৌশলগত বহুমুখিতা গ্রহণ করে দেশটিকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে হবে। চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাজার, ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং গাল্ফের সঙ্গে শ্রমিক রপ্তানি, সবকিছুকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে পরিচালনা করতে হবে। জলবায়ু কূটনীতি, প্রযুক্তি বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা হবে এই যাত্রার মূল চাবিকাঠি।

আগামী পঞ্চাশ বছরে পৃথিবী অনেক বদলে যাবে। প্রযুক্তির এককত্ব, জলবায়ু সংকট, সম্পদের যুদ্ধ এবং মানব সভ্যতার নতুন সংজ্ঞায়ন দেখা যাবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও একটি স্থায়ী সত্য রয়ে যাবে — যে জাতি পরিবর্তনকে বুঝতে পারবে, নিজেকে অভিযোজিত করতে পারবে এবং জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে পারবে, সেই জাতিই টিকে থাকবে এবং নেতৃত্ব দেবে।

শেষ কথা, এই সন্ধিক্ষণ শুধু শক্তির লড়াই নয়, মানব সভ্যতার নতুন অধ্যায় রচনারও। ট্রাম্পের কৌশল, জিয়াং-এর বিশ্লেষণ, ধর্মের প্রভাব এবং মধ্যম শক্তির উত্থান — সব মিলিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা হচ্ছে। বাংলাদেশসহ সকল জাতির জন্য এখন সময় এসেছে দূরদর্শিতা, সৃজনশীলতা এবং সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার। অনিশ্চয়তার মধ্যেও সম্ভাবনা অসীম। যারা এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাবে এবং নিজেকে তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে, একমাত্র তারাই আগামী দিনের বিজয়ী হবে।

বিশ্বব্যবস্থার এই নতুন অধ্যায় আমাদের সকলকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ইতিহাস কখনো থেমে থাকে না। এখন প্রশ্ন হলো — আমরা কি এই ইতিহাসের নীরব দর্শক হয়ে থাকব, নাকি তার সক্রিয় অংশীদার হয়ে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব?

(লেখক একজন কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সম্পাদক)