চলতি মে মাসের অস্বাভাবিক অতিবৃষ্টিতে ভোলার বিস্তীর্ণ রবি শস্যের মাঠ তলিয়ে গিয়ে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছেন জেলার প্রায় ২৩ হাজার ৩৭৩ জন কৃষক। ফসল ঘরে তোলার ঠিক আগমুহূর্তে ক্ষেতে পানি জমে তিন ভাগের দুই ভাগ ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে উপকূলীয় এ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের।
ভোলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, অতিবৃষ্টিতে জেলায় ১ হাজার ৪২৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ৬৯৫ হেক্টর চিনাবাদাম, ২৬৫ হেক্টর সয়াবিন, ১৫০ হেক্টর মুগডাল, ৩৫ হেক্টর ফেলন ডাল, ৬৮ হেক্টর শাকসবজি এবং ১০০ হেক্টর কাঁচামরিচের। এতে প্রায় ৩ হাজার ৯৬৭ মেট্রিক টন শস্য নষ্ট হয়েছে এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
সরেজমিনে ভোলা সদরের চরসামাইয়া, আলীনগর ও বাপ্তা ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, যেখানে এ সময়ে মাঠ শুকনো থাকার কথা, সেখানে জমে আছে হাঁটুসমান পানি। পানির নিচে ডুবে রয়েছে সয়াবিন, চিনাবাদাম, মুগডাল ও ফেলনের ক্ষেত। অধিকাংশ গাছ পচে নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ কেউ অবশিষ্ট ফসল কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন, আবার অনেকে ক্ষোভ ও হতাশায় ক্ষেতেই ফসল ফেলে রেখেছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, রবি শস্যের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন শুকনো আবহাওয়া। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত জলাবদ্ধতা এ ফসলের সবচেয়ে বড় শত্রু। আর এবার সেই জলাবদ্ধতাই কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বপ্ন ও পুঁজি।
কৃষক দুলাল পাটোয়ারী বলেন, ধারদেনা করে ২৪ কাঠা জমিতে সয়াবিন চাষ করেছিলাম। এবার ফলনও অনেক ভালো হয়েছিল। আশা ছিল মে মাসের মাঝামাঝি ফসল ঘরে তুলবো। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে ১৬ কাঠা জমির সয়াবিন পুরোপুরি পচে গেছে। প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন অবশিষ্ট ফসল কাটলেও শ্রমিকের খরচ উঠবে না।
আপর কৃষক মো. হান্নান জানান, ১৯ কাঠা জমির মধ্যে প্রায় ১২ কাঠা জমির সয়াবিন শেষ হয়ে গেছে। ক্ষেতে এক ফুটের মতো পানি জমে আছে। সয়াবিন গাছের গোড়াতেই বেশি ফলন হয়, আর সেই অংশটাই পানিতে পচে গেছে।
কৃষক মো. আলী বলেন, শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। অথচ এখন একজন শ্রমিক তার মজুরির সমান সয়াবিনও তুলতে পারছে না। দেনা শোধ করবো কিভাবে বুঝতে পারছি না।
একই চিত্র চিনাবাদামের ক্ষেতেও।
কৃষক আব্দুল হালিম জানান, ৩ কাঠা জমিতে চিনাবাদাম লাগিয়েছিলাম। প্রায় ১১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির পানি জমে মাটির নিচেই সব বাদাম পচে গেছে। সরকারি সহায়তা না পেলে সামনে আর আবাদ করতে পারবো কিনা জানি না।”
এবিষয়ে ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. শামীম আহমেদ বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকারি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।