‘মৃত্যুর আগে শেষ কিছুদিন মাঠে কাটাতে চাই’

সিলেট টেস্টের আগে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন মুশফিকুর রহিম। ১০১ টেস্ট খেলায় অভিজ্ঞ এই ব্যাটার কথা বলেছেন নানা প্রসঙ্গে

টেস্টে পেসারদের প্রভাব

মুশফিকুর রহিম : টেস্টে আগে অভিজ্ঞতার দিক থেকে বোলিং বিভাগে ঘাটতি ছিল। বলতে পারেন পেসাররা তরুণ। তবে ঐ দিক থেকে তরুণ বলতে চাই না। রানাকে দেখেন, অনেক বছর ক্রিকেট খেলছে। হয়তো টেস্টে নতুন। আমাদের বোলিং বিভাগের ২০ উইকেট নেওয়ার সামর্থ্য এখন আরও বেশি। আমাদের স্পিনাররা বরাবরই ভালো ছিল। যখন বোলিং ডিপার্টমেন্টে এমন ফাস্ট বোলার যুক্ত হয়ে যায়... আমরা ব্যাটাররা ধারাবাহিকভাবে যদি ভালো খেলতে পারি... গত ৩-৪ বছর ধরে খুব ভালো হচ্ছে টেস্ট ক্রিকেটে। সেদিক থেকে বলব এটা একটা ব্লেসিং এবং ক্যাপ্টেনের জন্য স্বস্তি। আমাদের সময় ২০ উইকেট নেওয়ার মতো ৪ জন বোলার থাকত না, ১-২ জন হয়তো ছিল। আমার জন্যও কঠিন হতো (ক্যাপ্টেন থাকাকালে)। বা আমার প্রেও যারা করেছেন, এটা হতো। এখন আমাদের বৈচিত্র্য অনেক। এখন যেকোনো কন্ডিশন, হোক সেটা পেস স্পিন বা স্পোর্টিং, সেখানে ফলাফল বের করতে সুবিধা হবে। শুধু ঐ নির্দিষ্ট ৫দিন এক্সিকিউট করতে হবে। উন্নতি এখন পর্যন্ত খুব ভালো। ধারাবাহিকতা রাখতে হবে।

টেস্ট ক্রিকেট এতদূর আসতে অবদান

মুশফিক : আমার ক্যারিয়ার প্রায় শেষ। প্রতিটি দিনই ব্লেসিং। আমি খুব উপভোগ করছি। আমি টেস্টকে সবসময় প্রাধান্য দিই। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট এতদূর আসার পেছনে ২ জনের অনেক বড় অবদান। একজন মুমিনুল, একজন তাইজুল। আমি ২-৩ বছর ধরে এক ফরম্যাট খেলছি। ওদের পেইনটা এখন বুঝতে পারছি। ওরা প্রায় ১০-১২ বছর কোনো অভিযোগ ছাড়া দিনের পর দিন কাজটা করে গেছে। এটা সহজ নয়। আমি যতটুকুই খেলি, ঐ দুজনের দিকে তাকালে বেশি ভালো লাগে। আমি কন্ট্রিবিউট করতে পারলে ওদের হাসি, খুশিটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। দলের আবহাওয়া খুবই পজিটিভ। এখানে ধারাবাহিক পারফর্মারের সংখ্যাই বেশি। যেকোনো চ্যালেঞ্জ এলে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। গত ৬-৭ বছরে এটা বড় পরিবর্তন।

ওয়ানডেতে ফেরা

মুশফিক : ওয়ানডেতে ফেরার প্রস্তাব এসেছিল আমার কাছে। তবে আমার কাছে মনে হয় বাংলাদেশ দল এখন এমন অবস্থানে আছে বা ভবিষ্যতে যাবে, আমার মনে হয় আমার সার্ভিস ইনশাআল্লাহ দরকার হবে না।

শান্তর ব্যাটিং

মুশফিক : শান্ত মাশাআল্লাহ খুবই ভালো ব্যাটিং করছে। ওর দায়িত্ব যত বেশি আসে, তত পজিটিভলি নেয় এবং ডেলিভার করে। একজন খেলোয়াড় যখন এভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়, দলের জন্য এটা বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায় এবং সবার অনুসরণ না করে উপায় থাকে না। হি ইজ অ্যা গ্রেট লিডার। এই ধারাবাহিকতা যেন ওয়ানডে বা যে কয়টা ফরম্যাট খেলছে সেখানেও নিয়ে যায়।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ও অস্ট্রেলিয়া সফর

মুশফিক : আমাদের ইচ্ছা গতবারের চেয়ে যেন এগিয়ে থাকি। হোমে যে কয়টা ম্যাচ আছে, সর্বোচ্চ পয়েন্ট যেন নিতে পারি। দুটো ট্যুর আছে বাইরে, মোটেও সহজ না। ওখানে কখনো আমরা খেলিনি, আমার ক্যারিয়ারে তো কখনো খেলাই হয়নি। তবে আমাদের বোলিং ভারসাম্য আছে। বোর্ডে রান দিলে যেকোনো প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ দিতে পারি। এটা আমার জন্য নতুন এক জিনিস, যে চ্যালেঞ্জের জন্য মুখিয়ে আছি।

এত বছরের ডাক এবার ডাকল। আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। সহজ হবে না। সুযোগ অন্তত আছে, গত ৩-৪ বছরের ভালো ক্রিকেট ওখানেও দেখানোর সুযোগ। যেহেতু কন্ডিশন ওখানে পেস বান্ধব, আমাদের পেসাররা এক্সাইটেড। তারা সেরা ছন্দে থাকলে ইনশাআল্লাহ অস্ট্রেলিয়াকে টাফ টাইম দেব। এটা তো অনেক বড় স্বপ্ন। নাহিদ না শুধু, তাসকিন-শরিফুল আশা করব তারা সুস্থ থাকবে এবং ডেলিভার করবে।

অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি

মুশফিক : আমি আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করার চেষ্টা করি। একটু হলেও ধারণা আছে। শুধু টেস্টেই না, মুমিনুল বলেন বা তরুণ অমিত, আমরা ২৫-৩০ বছর ধরে সবাইকে চিনি। কোথাও না কোথাও একসঙ্গে খেলেছি। আমাদের সবার বোঝাপড়া অনেক ভালো। ওদের যেটা লাগে নেওয়ার চেষ্টা করে। আমিও আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে দলে কন্ট্রিবিউটের চেষ্টা করি।

এটাই বেস্ট টেস্ট টিম কি না

মুশফিক : আগেও অনেক গ্রেট প্লেয়ার খেলেছে। ধারাবাহিকতার দিক থেকে এখন যে দল খেলছে, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ধারাবাহিক। আগে এক বছরে ২-৩টি টেস্ট খেলতাম। দীর্ঘদিন পর খেলে রেজাল্ট করা খুব কঠিন। এখন বছরে ৬-৭ বা ৮-১০টি খেলি। এখন রেজাল্ট করা তাই আগের চেয়ে সহজ। এখন যারা আছে তারা অভিজ্ঞ বিশেষ করে ব্যাটাররা। তারা পারফর্ম করছে। পারফর্মারের সংখ্যা অনেক বেশি। একটা দলে পারফর্মার ৭-৮ জন হলে যে ফরম্যাটই হোক দল ভালো করবে।

অস্ট্রেলিয়াকে মেসেজ দেওয়া

মুশফিক : এত বছরের ডাক এবার ডাকল। আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। সহজ হবে না। সুযোগ অন্তত আছে, গত ৩-৪ বছরের ভালো ক্রিকেট ওখানেও দেখানোর সুযোগ। যেহেতু কন্ডিশন ওখানে পেস বান্ধব, আমাদের পেসাররা এক্সাইটেড। তারা সেরা ছন্দে থাকলে ইনশাআল্লাহ অস্ট্রেলিয়াকে টাফ টাইম দেব। এটা তো অনেক বড় স্বপ্ন। নাহিদ না শুধু, তাসকিন-শরিফুল আশা করব তারা সুস্থ থাকবে এবং ডেলিভার করবে।

এক ফরম্যাট, টেস্ট স্পেশালিস্ট

মুশফিক : তাদের কষ্ট দেখে এখন অনুধাবন হচ্ছে। তবে আমি আমার পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারছি যা গত ১৫-১৬ বছরে দিতে পারিনি। এটাও বড় পাওয়া। যে কদিনই খেলব চেষ্টা করব যেন কন্ট্রিবিউট করতে পারি, টেস্ট দলকে দারুণ কিছু জয়ের মুহূর্ত দিতে পারি। অবসরের পর যেন একটু হলেও গর্ব করতে পারি।

নাহিদ রানা প্রসঙ্গ

মুশফিক : নাহিদ সম্পর্কে বলি, ফার্স্ট ক্লাস থেকেই ওকে চিনি। রাজশাহীর হয়ে সর্বশেষ যখন খেলি তখন থেকেই ওকে চিনি। আমি জানতাম ও অবশ্যই জাতীয় দলে খেলবে। তখন থেকেই ওর যে শেখার আগ্রহ বা উন্নতির ইচ্ছা, এটা তরুণদের কম থাকে, থাকলেও বলতে সংকোচ করে। ও সংকোচ করত না। নিয়মিত পুশ করত, আরও কীভাবে ভালো করা যায়। আমি দেখে অবাক ও খুশি হয়েছিলাম। এখনো ও এত ভালো খেলার পরও যেভাবে ভাবে কোনো ব্যাটারকে নিয়ে, ওয়ার্ক ইথিক নিয়ে, খাওয়া-দাওয়া নিয়ে। খুব ভালো সাইন। তরুণরা এমন থাকলে দলের পরিবেশ বদলে যায়।

পরবর্তী মুশফিক কে হবে

মুশফিক : এটা খুব কঠিন প্রশ্ন। চেষ্টা করব আমি ছাড়ার আগে যেন আরও ২-৩টা প্লেয়ার ঐ জায়গায় থাকে। ওয়ানডে দলে যেমন গ্যাপ সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাপ তখনই হয় যখন ‘এ’ দল বা এইচপির ট্যুর বা খেলা হয় না। এখন যারা ঐ জায়গায় আছে তারা যেন যথেষ্ট কোয়ালিটি ম্যাচ খেলে। পরের ১৫-২০ বছর যেন ওরকম সার্ভিস দিতে পারে। নাম বলা কঠিন। তবে অমিতকে নিয়ে আমি আশাবাদী। ও যে টাইপ ক্যারেক্টার, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। কাজ করে যেতে হবে।

অবসর ভাবনা

মুশফিক : না এমন কিছু না। মৃত্যুর আগে শেষ কিছুদিন বেঁচে থাকার খুব ইচ্ছা। যে কয়টা দিন মাঠে কাটাতে পারি। ছাড়ব বা কবে ছাড়ব সিদ্ধান্ত নিইনি। তবে ভালো সময় থাকতেই ইনশাআল্লাহ ছেড়ে দেব।