সিলেটে ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে ১২৬ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলার পর দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছিলেন লিটন দাস। স্বভাবসুলভ শান্ত ও পরিণত কণ্ঠে ব্যাখ্যা করলেন কীভাবে লোয়ার অর্ডার বা টেল এন্ডারদের নিয়ে এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন, কেনই বা সিঙ্গেল নেওয়ার সুযোগ থাকার পরও তা ফিরিয়ে দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিটনের মুখ থেকে উঠে এসেছে তাঁর রণকৌশল, রাওয়ালপিন্ডির স্মৃতি এবং সংকটের মুহূর্তে তাঁর ব্যাটিং উপভোগ করার মানসিকতার কথা।
ইনিংসে বারবার সিঙ্গেল রিফিউজ করা এবং স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখার কৌশল নিয়ে লিটন বলেন, “আমার রোলটা একটু ভিন্ন। টেস্টে মাঝে মাঝে ব্যাট করতে হয় মুশফিক ভাইয়ের সাথে, মিরাজের সাথে। সাথে ব্যাটার থাকলে মাইন্ড সেটআপ অন্যরকম থাকে। আপনি জানেন সিঙ্গেল চাইলে সিঙ্গেল হয়ে যাবে। টেল তো খুব একটা স্ট্রং না, যাদের প্রতি ওভারে খেলার সুযোগ করে দিব।”
ভবিষ্যতের প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতে যদি টেল আরও ভালো ব্যাটিং করে, প্রথম বলে সিঙ্গেল নিয়ে নিলেও ওরা খেলতে পারবে। কঠিন… তবে টেলে যারাই ব্যাট করছে—তাইজুল ভাই, তাসকিন, শরিফুল—তিনজনই অনেক বল মোকাবেলা করেছেন। যেটা বিগ টোটাল। রান তো আমাকেই করতে হবে, ব্যাটার হিসেবে দায়িত্বও আমার—স্বাভাবিক। তবে তারা উইকেটে থাকলে কাজ সহজ হয়ে যায় আমার।”
২০২৪ সালের রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট বা মিরপুরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষের সেঞ্চুরির সাথে আজকের ইনিংসের তুলনা করতে গিয়ে লিটন একে সম্পূর্ণ আলাদা তকমা দিলেন, “শ্রীলঙ্কার সাথে যে ইনিংস ছিল, পুরোপুরি ভিন্ন। মুশফিক ভাইর সাথে জুটি ছিল। পার্টনার ব্যাটার হলে মাইন্ডসেট ক্লিয়ার থাকে। রাওয়ালপিন্ডিতে মিরাজ ছিল। আজ একেবারেই ভিন্ন। যখন ২-৩ রানে আমি, তখনই তাইজুল ভাই আসে।”
সেঞ্চুরি নিয়ে বাড়তি কোনো চিন্তা ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, “সেঞ্চুরি বলে-কয়ে মানুষ করতে পারে না। আমি চিন্তিতও না যে সেঞ্চুরি করতেই হবে। আমার টার্গেট ছিল রান কীভাবে আসে। তাইজুল ভাই যখন এসেছে বোর্ডে আমাদের রান ১১৬। কীভাবে দলকে ২০০ পর্যন্ত নেওয়া যায় (সেই চিন্তা ছিল)। অবশ্যই এই টার্গেট আমাকেই ফিলাপ করতে হবে, টেল তো রান করবে না। ড্রেসিংরুম থেকে একটা ইনফরমেশন চেয়েছিলাম যে অ্যাটাকিংয়ে যাব কিনা; বলেছে রানের জন্য খেলতে।”
রাওয়ালপিন্ডির ম্যাচের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে কিনা—এমন প্রশ্নে লিটনের জবাব, “অনেকটাই। রানের চাপ সবারই থাকে। স্কোরিং অপরচুনিটি দেখুন, পেস বলে ছক্কা মেরে রান করতে হয়েছে। এত সহজ ছিল না, আউটফিল্ড অনেক স্লো। ভাগ্যের ব্যাপার বলব, ক্রিকেটে সবসময় একশয় একশ থাকবেন তা না। ভাগ্যও কাজে লাগাতে হয়।”
দলের ক্রাইসিস মোমেন্ট বা কঠিন পরিস্থিতি উপভোগ করেন কিনা, জানতে চাইলে এই স্টাইলিশ ব্যাটার বলেন, “আমার ভূমিকাই ভিন্ন। কোনো দিন টপ অর্ডার রান করছে, আমি ব্যাট করছি ৬০-৭০ ওভারে, উইকেটে বল ঘোরা শুরু হলো। আমার খেলাই এমন, যে সময় আসবে সেটা উপভোগ করে খেলা। চ্যালেঞ্জ, তবে উপভোগের অনেক কিছুই ছিল।”
প্রথম ১০০ বলে ৫৩ রান করার পর পরের মাত্র ৩৫ বলে ৫০ রান করে সেঞ্চুরি ছোঁয়ার পেছনে উইকেটের আচরণ বদলে যাওয়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন লিটন, “হ্যাঁ, যখন উইকেটে নামি তখন এত সহজ ছিল না। যত সময় গেছে উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য আস্তে আস্তে ভালো হওয়া শুরু করেছে।” তবে টস জিতলে বাংলাদেশও যে একই সিদ্ধান্ত নিত, তা অকপটে স্বীকার করলেন, “যে কন্ডিশন ছিল যেকোনো দল টস জিতে বোলিং নিত। তারা (পাকিস্তান) অলআউট করত কিনা বলা মুশকিল, তারাও খেলতে এসেছে।”
বাউন্সারের বিপক্ষে প্রায় ১৫০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করা লিটন শেষ পর্যন্ত শর্ট বলেই আউট হয়েছেন। এ নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা, “বাউন্সার একটা স্কোরিং অপরচুনিটি আমার জন্য। যদিও দুর্ভাগ্যবশত আগের দুই ইনিংস আর আজকেও বাউন্সারেই আউট হয়ে গেছি। তবে আমি বাউন্সার অনেক উপভোগ করেছি।”
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে লিড পাবে কিনা, তা এখন সম্পূর্ণ বোলারদের ওপর ছেড়ে দিচ্ছেন লিটন, “আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। বোলারদের দায়িত্ব অনেক বাকি। একটা প্লাস পয়েন্ট হলো আউটফিল্ড অনেক স্লো, অনেক জোরে মারা লাগে বাউন্ডারির জন্য। সকালে যে উইকেট ছিল, আস্তে আস্তে ভালো হয়ে গেছে। তাই বোলারদের এখন ভালো করতে হবে।”