পদ্মা ব্যারাজ ও কূটনৈতিক ব্যালান্স

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন তারেক রহমান। পদ্মায় ব্যারাজ না করলে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে আমাদের। উজানের ফারাক্কা বাঁধের বিপরীতে, এমন উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। সাদা চোখে দেখলে সেটাই সত্য। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে আমরা দেখতে পাবো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও একটু গভীরে গেছেন তার সিদ্ধান্তের নতুন পরিপ্রেক্ষিত রচনায়। ৩৫ হাজার কোটি টাকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে, সমীক্ষাসহ অবকাঠামো নির্মাণে বেশ সময় লাগবে। সেটাই স্বাভাবিক। বহু বছর থেকেই পদ্মায় ব্যারাজ নির্মাণের কথা বলা হচ্ছিল, যাতে আমরা উপকারভোগী হতে পারি। আবার এই ব্যারাজের সুতো ধরে শাখা-প্রশাখা নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনারও কর্মযজ্ঞ শুরু করতে হবে। সেই কাজও সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। এটা সবাই বোঝেন যে, জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদ-নদীগুলোর তলদেশ ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষায় নদীর পানি উপচে পড়ে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেই সব নদ-নদীর অববাহিকার শস্য। আমরা এতে বিপুলভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছি। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য, পদ্মায় ব্যারাজ নির্মাণ ছিল বহুকালের জনদাবি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই দাবি পূরণের লক্ষ্যেই একনেকে সেই পরিকল্পনাকে বাস্তব করার চেষ্টা করছেন। পলি-বালি কেটে নিয়ে, দুই পাড় বেঁধে দিয়ে সেই সব নদীর স্রোত-প্রবাহ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগও জরুরি বিষয়। পদ্মা ব্যারাজের সঙ্গে এই নাব্যহীনতার যোগ আছে।

নদীগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতা না থাকলে, পদ্মা ব্যারাজের উপকার ভোগ করা যাবে না। তা আমরা দেখে আসছি তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে নদী কী পরিমাণ ভরাট হয়েছে এবং পানি সেখানে রাখা যায় না। ব্যারাজ অভিজ্ঞতা সেখান থেকেই আমরা দেখছি, বুঝেছি এবং সেই আলোই আমাদের আরও বহু কিছু করার পরিকল্পনা দেবে। এটাই আমাদের বিশ্বাস। শোনা যাচ্ছে তিস্তা নদীর যে পানি সংকট চলছে, তার হাত থেকে বাঁচার জন্য চীনের কাছে দেওয়া হতে পারে এই প্রকল্পটি। অবশ্য চীনের আগ্রহের পর, সেখানে সমীক্ষা হয়েছে। ইতিবাচক জনরোল উঠলে, ভারত ২০২৪-এ এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছিল। কিন্তু তা অনেক দেরিতে। চীনের আগ্রহ ও সমীক্ষা জরিপের পর, ভারতের এই আগ্রহ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তা বোঝা যাচ্ছে। এটা কিছুটা পাল্টাপাল্টির সিদ্ধান্ত। কিন্তু ভারত এর চেয়ে বেশি কিছু করেনি বা করছে না। অন্যদিকে, চীনা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যেই তিস্তার দুই পাড়ের জন্য মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করে দিয়েছে। তিস্তাপাড়ের মানুষেরা তাই খুশি। ২ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তিস্তার পানি না পেয়ে। রাজনৈতিক ভাষ্য হচ্ছে, ভারত তার চিকেন নেক শিলিগুড়ির এত কাছে চীনের উপস্থিতি মেনে নেবে না। কিন্তু এটা একটি অকূটনৈতিকসুলভ কথা। দেশটা আমাদের, সিদ্ধান্তও আমাদের। আমরা পদ্মায় পানি পাব না, আমাদের উত্তরবঙ্গ তিস্তার পানি প্রত্যাহারের কারণে মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে, তারপরও আমাদের মানতে হবে যে আমরা এটা করতে পারব না চীন ও ভারতের রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে। দেশ দুটির বিরোধিতা রাজনৈতিক। কূটনৈতিক পর্যায়ে সে সম্পর্ক স্বাভাবিক। সীমান্ত বিরোধ থাকলেও, তা বাণিজ্যে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। দুই দেশের মধ্যে ৫শ কোটি ডলার আদান-প্রদানের বাণিজ্য চলছে। অর্থাৎ বাণিজ্যে বিরোধ নেই। সম্পর্ক এটাই হতে পারে সব থেকে ভালো। ‘দেবে আর নেবে/মিলাবে মিলিবে’ যদি এই নীতি হয়, তাহলে কোনো সমস্যা থাকে না। সমস্যা হয় তখন যখন আমি ওটা চাই, আমাকে সেটা দিতে হবে। এই দস্যুবৃত্তিক মনোভাবই আমরা দেখেছি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথাবার্তায়। তিনি গ্রিনল্যান্ড চান। তিনি আইসল্যান্ড চান। তিনি ভেনেজুয়েলার তেল শুষে নিচ্ছেন, একজন প্রেসিডেন্টকে সামরিক শক্তিতে ক্ষমতাচ্যুত করে। তার এই দস্যুতাই সব সংকটের গোড়া। এই লাভ ও লোভের চিন্তা থেকে সরে এলেই সমস্যার সমাধান মেলে। ট্রাম্প সেই পথের মানুষ নন। বরং মনে করেন, তিনি ও তার দেশ পৃথিবীর এক নম্বর পরাশক্তি। তার হাবভাব আচার-আচরণ সে রকমই। তার মুখে লাগাম নেই।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিং সফর করে ফিরে গেছেন নিজের দেশে। তার ভাষায় তিনি অনেক কিছু অর্জন করেছেন। বিশেষ করে, বাণিজ্যের ব্যাপারে তার অর্জন এটাই যে চীন বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈশ্বিক নানা সমস্যা নিয়ে আলাপ করেছেন বলে মনে হয়। তিনি ইতিমধ্যেই তাইওয়ানের কাছে ১৪ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। তার মানে, তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে চান। নানা রকম নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও, চীনকে ঠেকানো যায়নি। চীন তা মানেনি। এই না মানার কারণে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে আর কোনো অবরোধ ব্যবস্থা নেবে কি না বোঝা যাচ্ছে না। প্রতিরোধের দেয়াল তুলেছিল বলে, চীনারা এখন চিপ সৃজন ও তৈরিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। সেমি কনডাক্টর বিষয়ে কিন্তু আমেরিকা কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। কারণ চীনা সেমি কনডাক্টর তার প্রয়োজন। তাইওয়ানের চেয়ে চীনকে বেশি প্রয়োজন, এটা ডোনাল্ড ট্রাম্প ভালো বোঝেন। এই বোঝার পেছনে আরও আছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধ চলেছে, সেখানে সে কাবু করতে পারেনি ইরানকে। আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করার পরও, ইরান দমেনি। বরং আরও শক্তিশালী কৌশল গ্রহণ করেছে। মার্কিনিরা হরমুজ প্রণালি অবরোধ করেছে। যুদ্ধবিরতির একমাস হলেও, পুনরায় আর কোনো হুংকার নেই ট্রাম্পের মুখে। বরং সে কামনা করছে ইরান যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, তা যেন অবমুক্ত করে দেয় সেই চেষ্টায়ই তিনি বেইজিং গিয়েছিলেন। তার সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। তেল বাণিজ্যের বিশ্বের ১৪ শতাংশই এই নৌপথ ব্যবহার করে হয়ে থাকে। ফলে আমরাই কেবল নই, হরমুজ প্রণালি বন্ধের ফল ভোগকারী তারাও ক্ষতিগ্রস্ত। তাই ট্রাম্প চান ইরান যেন হরমুজ খুলে দেয়। কিন্তু ইরান মার্কিনি অবরোধ তুলে না নিলে, হরমুজ খুলে দেবে না বলেছে। বোঝাই যাচ্ছে, সামরিক জোরে ইরানকে পর্যুদস্ত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। সে এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক অর্থনৈতিক শক্তির দেশ হয়েও, ইরানকে কাবু করে মাথা নত করাতে ব্যর্থ। তাহলে কি আমরা ধরে নেব, ডোনাল্ড ট্রাম্প কেবল অস্ত্র উৎপাদকদের চাপে পড়ে এই যুদ্ধ করেছেন? সে যে এখন কাগুজে বাঘে পরিণত হয়েছে, তার আরও বহু প্রমাণও আছে।

চীন সেটা টের পেয়েছে। শি জিনপিং চান যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিক যে কেবল তারাই পরাশক্তি নয়, এক নম্বরের সারিতে চীনও এসে পৌঁছে গেছে। চীনের পরাশক্তির কূটনৈতিক স্তরটি যে উন্নত হয়েছে, তা বোঝা যায়। সে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে কীভাবে হ্যান্ডেল করছে, সেটা দেখতে হবে। সে ইরানকে বলবে না যে, পরমাণু কর্মসূচি পরিত্যাগ করো। কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে নৌ-সামরিক অবরোধ ওমান সাগর থেকে তুলে নিতে বলবে সেই চাবিটি সৃষ্টি করে ফেলেছে। বিশ্বের তেলবাণিজ্যকে স্বাভাবিক করতে হলে, যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক নৌ-অবরোধ তুলে নিলেই কেবল মাত্র ইরানকে হরমুজ খুলে দেওয়ার কথায় সে রাজি করাতে পারবে। ইরানি তেলের বড় ক্রেতা চীন। হরমুজ বন্ধ থাকায়, চীনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাশিয়ার তেলেরও বড় ক্রেতা চীন। এখানে কূটনৈতিক শিক্ষার বিষয়টি আমাদের জন্য শেখার আছে। দুই পরাশক্তি কীভাবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি সামলাচ্ছে, সেটা বোঝা আমাদের উচিত। তিস্তা মহাপরিকল্পনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোন কৌশল নেবে তা শি জিনপিং-এর কাছে থেকে অনুমান করে নিতে পারেন। শি জিনপিং-এর বডি ল্যাঙ্গুয়েজই বলে দিচ্ছে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের না-হক কাজ পছন্দ করছেন না। আমাদের সেই ধরনের কৌশল নিতে হবে। এটা ঠিক যে ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব ভালো অবস্থানে আছে। সীমান্তে গুলি চালিয়ে হত্যা করার যে পাশবিক রীতি আজও চালাচ্ছে ভারত, সেটা বন্ধ না করলে কোনো রকম আলোচনাই হবে না দেশটির সঙ্গে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় যে ভয়টি আমাদের সচেতন জনমনে জেগেছে, তা নিরসন করা জরুরি। হিন্দুত্ববাদিতা দিয়ে পররাষ্ট্রকে সামাল দেওয়া যাবে না, সেটা ভারতকে বুঝতে হবে। সম্পর্ককে রাজনৈতিকভাবে না রেখে তাকে প্রতিবেশীর সঙ্গে কী আচরণ করা উচিত, সেই পথে আসতে হবে। তারা কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে সীমান্তে। আমরা এর প্রতিবাদ করতে পারি না। তার জায়গায় সে বেড়া দেবে কি দেবে না, সেই সিদ্ধান্ত তাদের বিষয়। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে মানুষ ভারত যায়, এই বিশ্বাস থেকে তারা কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি হিন্দুদের কেউ কেউ হয়তো অতীতে গেছে, এখন কোন কারণে তারা দেশ ছেড়ে যাবে?

দেশে চলছে রাজনৈতিকভাবে সম্প্রীতির শাসন। সাংস্কৃতিকভাবে সেই শাসনের ধারা আমরা লক্ষ করছি। আমাদের সরকার সব ধর্মের মানুষকে একই রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিতে দেখেন। নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনোরকম কিছু ঘটছে না এখন। এই সম্প্রীতিময় সহাবস্থানকে আমরা দেখি মানুষ হিসেবে। কাউকেই হিন্দু বলে নয়, কাউকেই মুসলিম বলে চিত্রিত করা নয়, সবাইকে ‘মানুষ’ হিসেবেই বিবেচনা করাই যে গণতান্তিক চেতনার একটি মৌলিক দৃষ্টি, তা আমাদের রাজনীতিকরা বোঝেন এবং সে ভাবেই আচরণ করেন। কিন্তু দুষ্টচক্র তো আর থেকে থাকে না। সীমান্ত দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া সত্ত্বেও আসছে নানা রকম মাদক। বাংলাদেশি বলে অনেক হিন্দুকে পুশইন করছে ভারত। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি নেতা বিজয়ী হয়েই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালিয়ে এখন কিছুটা শান্ত হয়েছেন। ধারণা করি, এই পরিস্থিতি নিজেদের স্বার্থেই তারা বন্ধুসুলভ করে আনবে। সেটাই হচ্ছে বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে তার রাজনৈতিক নীতিকে, ইতিবাচক করে তোলা। সত্য দুইভাবে প্রকাশ পায়। এক প্রান্ত থেকে সত্য একরকম, অন্যপ্রান্ত থেকে বা বিপরীত দিক থেকে সেই সত্যই ভিন্নরকম। এই সত্য মেনে, বুঝে চলাটাই কূটনৈতিকভাবে অর্জন করতে হবে। এর বাইরে গেলেই ক্ষতিকর। বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা এবং সৎপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ প্রয়োজন। সেই রকম আচরণ দিয়েই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক বিনির্মাণ করতে হবে।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

mahboob.hasan08@gmail.com