বাংলাদেশের হাওর অঞ্চল এক অনন্য ভৌগোলিক ও কৃষিভিত্তিক বাস্তবতার নাম, যেখানে জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির লড়াই প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা; সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নভূমি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই হাওর ব্যবস্থা, যেখানে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ, মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের সঙ্গে মানুষের জীবন গভীরভাবে জড়িত। প্রায় চার লাখ হেক্টর জমিজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল শুষ্ক মৌসুমে রূপ নেয় বিশাল ধানক্ষেতে আর বর্ষা এলে পরিণত হয় অখণ্ড জলরাশিতে, যেন প্রকৃতি নিজেই কৃষির ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করে। এই ভূখণ্ডের মধ্যে আনুমানিক ২.২ থেকে ২.৫ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়, যার গড় উৎপাদন ২০ থেকে ২৫ লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে। দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ এই অঞ্চল থেকেই আসে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বোরো মৌসুমই কৃষকের জীবিকার একমাত্র ভরসা। ধান বিক্রির অর্থেই কৃষক সারা বছরের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্র ও সামাজিক দায় পূরণ করে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী বছরের চাষের পুঁজিও জোগাড় করতে হয়। ফলে বোরো ধান শুধু কৃষিপণ্য নয়, এটি হাওরের মানুষের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি ও ভবিষ্যতের আশার প্রতীক; কিন্তু প্রতি বছর আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে এই একমাত্র ভরসাটিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফসল তোলার ঠিক আগমুহূর্তে কয়েক দিনের পানির তোড়ে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেলে, তা শুধু উৎপাদনের ক্ষতি নয় বরং পুরো বছরের জীবিকা হারানোর সমান। এর ফলে কৃষকের ঘামে ভেজা স্বপ্ন, ঋণ শোধের আশা, সন্তানের পড়াশোনার পরিকল্পনা সব পানির নিচে ডুবে যায়। এই বাস্তব নির্মমতা আমাদের সামনে একটিই প্রশ্ন ছুড়ে দেয় আমরা কি কেবল দর্শক থাকব, নাকি সত্যিই তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসব? এটি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং পরিকল্পনার ঘাটতি, সময়মতো প্রস্তুতির অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার দীর্ঘ প্রোথিত ফল, যার ফলে প্রতি বছরই একই ধরনের ক্ষতি ফিরে আসে এবং হাওরের কৃষক সমাজকে অনিশ্চয়তার অবিরাম চক্রে রাখে।
হাওরের কৃষকের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে আগাম বন্যা ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, যা এখন আর কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং ক্রমে অনিয়ন্ত্রিত ও অনির্দেশ্য এক ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে। হাওর অঞ্চলের এই বাস্তবতায় আবহাওয়ার পরিবর্তিত ধারা আর আগের মতো পূর্বানুমেয় নয়, ফলে কৃষকের পরিকল্পনাও হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। মার্চ কিংবা এপ্রিলেই আকস্মিক ঢল নেমে আসে, যখন ধান কাটার জন্য প্রস্তুত থাকে এবং ক্ষেতের ফসল যেন ঘরে তোলার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে; ঠিক সেই সময়ে অপ্রত্যাশিত পানির স্রোত এসে কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো মৌসুমের ফসল পানির নিচে ডুবিয়ে দেয়। এই ক্ষতি কেবল উৎপাদনের ক্ষতি নয়, বরং কৃষকের সারা বছরের শ্রম, বিনিয়োগ এবং প্রত্যাশার একসঙ্গে ভেঙে পড়া, যা তাকে মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ফলে এই অনিশ্চয়তা কৃষকের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং তাকে ঋণের দুষ্টচক্রে ফেলে, যেখানে এক মৌসুমের ক্ষতি পূরণ করতে গিয়ে তাকে নতুন করে ঋণ নিতে হয়, আর সেই ঋণ পরিশোধের চাপ তাকে পরবর্তী মৌসুমেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিলম্ব, যা ধীরে ধীরে একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে এবং প্রতি বছরই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটায়; হাওর অঞ্চলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ভূপ্রকৃতিতে যেখানে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে প্রতি বছরই শোনা যায় সময়মতো বাঁধ নির্মাণ শেষ হয় না, কিংবা নিম্নমানের কাজের কারণে তা অল্প চাপেই ভেঙে যায়, ফলে পুরো সুরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। স্থানীয়ভাবে তদারকির অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও গভীর করে। কৃষক তখন প্রকৃতির সঙ্গে নয়, মানুষের তৈরি ব্যর্থতার সঙ্গেও লড়াই করে, যেখানে তার প্রতিপক্ষ শুধু বন্যা বা ঢল নয়, বরং অব্যবস্থাপনা ও অবহেলাও। একই সঙ্গে কৃষি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়, কারণ কোথায় কোন জাতের ধান লাগানো উচিত, কখন রোপণ ও কাটার সময় নির্ধারণ করা দরকার এসব বিষয়ে সমন্বিত দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে; ফলে কৃষক অনেক সময় অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরিবর্তিত জলবায়ুর বাস্তবতায় সবসময় কার্যকর হয় না। এই সমন্বয়হীনতা ও দুর্বল পরিকল্পনা একদিকে উৎপাদন ঝুঁকি বাড়ায়, অন্যদিকে কৃষকের ক্ষতির মাত্রাকেও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা। কারণ হাওরের মতো সংবেদনশীল ভূপ্রকৃতিতে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণই কৃষি টিকে থাকার মূল শর্ত। হাওর অঞ্চলের বাস্তবতায় নদী ও খাল খনন, প্রাকৃতিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে এমনভাবে, যাতে তা কেবল অস্থায়ী সমাধান না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা প্রদান করতে পারে। শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, তা বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, কারণ পরিকল্পনা যত ভালোই হোক, বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকলে তার সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছায় না এবং কৃষক শেষ পর্যন্ত বঞ্চিতই থেকে যায়। কৃষকদের বাঁচাতে সরাসরি সহায়তা অপরিহার্য এবং এই সহায়তা কেবল দায়সারা উদ্যোগ না হয়ে একটি সুসংগঠিত ও সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হওয়া দরকার; হাওর অঞ্চলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য খাদ্য সহায়তা, সুদমুক্ত বা স্বল্পসুদে ঋণ এবং নগদ প্রণোদনা দিতে হবে দ্রুততার সঙ্গে, যাতে তারা তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামলে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সহায়তা আসে দেরিতে বা সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছায় না, যা পুরো উদ্যোগের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের হতাশ করে তোলে; এই বাস্তবতা বদলাতে ডিজিটাল তালিকা প্রণয়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করা দরকার, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। এখানে সরকারের দায়িত্ব হলো, একটি নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ তৈরি করা, নিয়মিত আপডেট রাখা এবং স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর তদারকি কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে সহায়তা দ্রুত ও সঠিকভাবে বিতরণ করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। হাওরের মানুষই তাদের পরিবেশ সবচেয়ে ভালো বোঝে। তাই বাঁধ নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কৃষি পরিকল্পনায় তাদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। স্থানীয় কমিটি, কৃষক সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পের গুণগত মান বাড়বে এবং দুর্নীতি ও অনিয়মও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। হাওরের কৃষককে বাঁচানো মানে কেবল একটি অঞ্চলকে রক্ষা করা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত করা, যা জাতীয় অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন
rssarker69@gmail.com