বিশ্ব অর্থনীতি এক অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল সময় অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ও জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর সঙ্গে প্রযুক্তিগত আমূল পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার কর্মসংস্থানের প্রথাগত ধরনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। জীবনযাত্রার ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি সংকুচিত হয়েছে চাকরির বাজার। ফলে তরুণ সমাজের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেবল চাকরির আশায় বসে থাকা, নাকি নিজেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা? এই বাস্তবতায় উদ্যোক্তা হওয়া এখন কেবল বিকল্প নয়, বরং সময়ের অনিবার্য দাবি। বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব বর্তমানে জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ২৬.২৪ লাখ বেকারের মধ্যে প্রায় ৮.৮৫ লাখই স্নাতক বা উচ্চশিক্ষিত, যা মোট বেকারের এক-তৃতীয়াংশ। বর্তমানে গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত আট বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার অসামঞ্জস্যতা এবং কারিগরি দক্ষতার অভাব এই সমস্যার মূল কারণ। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর অনেক গ্র্যাজুয়েটকে দীর্ঘ দুই বছর বা তারও বেশি সময় বেকার থাকতে হচ্ছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ২০.৩ শতাংশই কোনো শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের আওতায় নেই। ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল পুঁথিগত বিদ্যার ওপর নির্ভর না করে, সময়োপযোগী কারিগরি দক্ষতা অর্জন এবং চাকরিনির্ভর মানসিকতা ত্যাগ করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নই হতে পারে বেকারত্ব সংকট মোকাবিলার প্রধান উপায়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ এবং শিল্প খাতের অধিকাংশ কর্মসংস্থান এই খাত থেকেই সৃষ্টি হয়। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭৮ লাখের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ রয়েছে, যা দেশের মোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৯ শতাংশ। এসব উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই বাড়াচ্ছে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার বাংলাদেশে সেই সুযোগ তৈরি করেছে এবং স্বল্প পুঁজিতে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজ করেছে। দেশে এখন ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে, যা ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের বড় বাজার গড়ে তুলেছে। বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং ই-কমার্স খাতের বাজার ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি ১২ লাখের বেশি ফ্রিল্যান্সার বছরে প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন। একটি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করেই তরুণরা এখন ইউটিউব, ডিজিটাল মার্কেটিং ও অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আয় করছেন। ফলে প্রযুক্তি তরুণদের চাকরিনির্ভরতা কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন পথ তৈরি করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নারীদের জন্য ঘরে বসে আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশের ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসায়ীদের প্রায় ৫০ শতাংশই নারী উদ্যোক্তা। ই-ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি নারী সরাসরি ই-কমার্স ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। পোশাক, হস্তশিল্প, খাদ্যপণ্য ও অনলাইন সেবার মতো ক্ষেত্রগুলোতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কেবল আর্থিক স্বাধীনতাই দিচ্ছে না, বরং পরিবার ও সমাজেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। ২০২৬ সালের এ সময়ে নারীদের এই ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ জাতীয় জিডিপিতে (এউচ) অবদান বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে। সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ ভিশনের আওতায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং স্টার্টআপদের জন্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফান্ড সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি আইসিটি বিভাগের মাধ্যমে হাইটেক পার্ক ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো সহজে ঋণ সুবিধা পান না। ব্যাংকিং জটিলতা, জামানতের শর্ত ও উচ্চ সুদের কারণে প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বাইরে রয়ে গেছেন।
আমাদের সমাজে এখনো চাকরিকে নিরাপদ ও সম্মানজনক মনে করা হয়। অনেক পরিবার ব্যবসাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে সন্তানদের উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করে। অথচ অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস বলেছিলেন, ‘যারা মনে করে যে তারা পৃথিবীটাকে বদলে দিতে পারে, শেষ পর্যন্ত তারাই তা করতে সক্ষম হয়।’ এই আত্মবিশ্বাস ও সাহসই একজন উদ্যোক্তার মূল শক্তি। বিশে^র উন্নত দেশগুলোতে উদ্যোক্তারাই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। একজন উদ্যোক্তা শুধু নিজের জীবনের পরিবর্তন ঘটান না, বরং অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। তাই উদ্যোক্তাকে ছোট করে দেখার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে এবং তরুণদের নতুন উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহ দিতে হবে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাবাদ এখন উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। বর্তমানে দেশের জিডিপিতে কৃষি ও গ্রামীণ খাতের অবদান প্রায় ১২ শতাংশের বেশি, কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে অনেক সম্পদ নষ্ট হয়। কৃষিভিত্তিক শিল্প, মৎস্য ও হস্তশিল্পে গ্রামের তরুণরা উদ্যোগী হলে এই চিত্র দ্রুত বদলে যেতে পারে।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে চাকরিমুখী, যা তরুণদের সৃজনশীলতাকে সীমাবদ্ধ করছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা শেষ করা গ্র্যাজুয়েটদের প্রায় ৪৭ শতাংশই কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতার অভাবে বেকার থাকছেন। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের পাঠ্যক্রমে উদ্যোক্তা বিষয়ক ব্যবহারিক শিক্ষার হার দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা শিক্ষা ও বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার চালু করা অপরিহার্য। ২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে সৃজনশীলতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনই এখন একমাত্র টেকসই সমাধান। অর্থনৈতিক বাস্তবতায়, উদ্যোক্তা হওয়াই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। সীমিত চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা, দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রতিকূলতা জয় করে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রকে দিতে হবে সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ ও নীতিগত সহায়তা। একই সঙ্গে সমাজকেও উদ্যোক্তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা সমাজই পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও টেকসই, আত্মনির্ভরশীল ও ভবিষ্যৎমুখী করে তুলতে।
লেখক: প্রভাষক ও কলাম লেখক
jasim6809786@gmail.com