প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দৌড়ে পারছেন না অন্যরা

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিনি সরকারি ছুটির দিনেও অফিস করছেন। গত ২ এপ্রিল টানা ১৬ ঘণ্টা দাপ্তরিক কাজ করে তিনি প্রশাসনে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাজের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মন্ত্রী, এমপি ও আমলারা। দেশ রূপান্তরকে এমনটাই জানিয়েছেন তারা নিজেরাই।

সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টার মধ্যে সচিবালয়ে প্রবেশ করছেন। তিনি সকালেই চলে আসায় আমাদেরকে একই সময়ে, অনেক ক্ষেত্রে আগেভাগেই সচিবালয়ে প্রবেশ করতে হচ্ছে। কখন কোন মন্ত্রীকে তিনি ডেকে পাঠান সেটা তো আর বলা যাবে না। সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করতে হচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। প্রাথমিক পর্যায়ে কষ্ট হলেও এখন মানিয়ে নিচ্ছি। আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি আমরা। এর ফল শুধু বিএনপি সরকার নয়, দেশের মানুষ ভোগ করতে পারবে। ভালো ফলাফল বয়ে আনবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী কাজে প্রধানমন্ত্রীর এই অভাবনীয় গতি এবং কড়া নজরদারির সঙ্গে মানিয়ে নিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন অনেক মন্ত্রী, এমপি ও আমলা। বিশেষ করে জনপ্রশাসন, জ্বালানি ও আইন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের কাজে প্রধানমন্ত্রী যে কঠোর সময়সীমা (ডেডলাইন) বেঁধে দিচ্ছেন, তা পূরণ করতে সংশ্লিষ্টদের নাভিশ্বাস উঠছে।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করে নতুন সরকার। সে হিসেবে সরকারের আজ তিন মাস পূর্ণ হলো। তিন মাসের এই সময় পর্যালোচনায় সবার আলোচনার মধ্যেই এসেছে প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্ব। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্য সবাই দৌড়াতে পারলে অনেক কিছুই পরিবর্তন সম্ভব।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নেতা দেশে ফিরে ঘোষণা দিয়েছিলেন “আই হ্যাভ এ প্ল্যান”। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী। তার এই কর্মযজ্ঞের সারথি হয়েছি আমরা। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছি। এর সুফল শিগগিরই দেশবাসী পাবে। তার এই কাজের গতি মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেছে এবং সাধুবাদ জানাচ্ছে। তার স্বপ্ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। অতীতে কোনো সরকারের প্রধান এভাবে কাজ করেছে কি না তা জানা নেই।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের কাজ সুষ্ঠুভাবে পালনের পাশাপাশি সময় পেলে নিজ নির্বাচনী এলাকায় ফিরে যাচ্ছি। নিজ এলাকার মানুষের পাশাপাশি দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করছি।’

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কাজের গতি অতীতের যেকোনো সময়ের প্রধানমন্ত্রীর চাইতে অনেক বেশি। দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে অবিরাম পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। তার কাজের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরাও কাজ করে যাচ্ছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রতিমন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কাজের বিষয়ে অত্যন্ত আপসহীন। তিনি নিজে যেমন গভীর রাত পর্যন্ত ফাইল দেখেন, আমাদের কাছ থেকেও একই ধরনের একাগ্রতা আশা করেন। আগে যেখানে কোনো প্রকল্পের কাজ মাসের পর মাস পড়ে থাকত, এখন সেখানে প্রতি সপ্তাহে জবাবদিহি করতে হচ্ছে।’

তিনি অরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিনের কাজের রিপোর্ট প্রতিদিন পর্যালোচনার সংস্কৃতি চালু করেছেন। সকালে সচিবালয়ে বা সংসদীয় কমিটির বৈঠকে দেওয়া নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটুকু হলো, তা সন্ধ্যা নাগাদ তাকে অবহিত করতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই ‘জিরো টলারেন্স’ ও ‘কুইক রেসপন্স’ নীতিতে অনেক প্রবীণ মন্ত্রীও চাপের মুখে পড়েছেন।

সরকারের একাধিক মন্ত্রী জানান, দেশের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় মন্ত্রী, এমপি ও আমলাদের প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ সফর না করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিগত সরকারের সময়ের মতো এখন চাইলেই কেউ বিদেশ ট্যুর করতে পারছেন না। প্রধানমন্ত্রী নিজেও অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর পরিহার করছেন এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে কৃচ্ছ্রসাধন নীতিতে জোর দিচ্ছেন। সরকারি অর্থের অপচয় রোধে ইতিমধ্যে নিজের গাড়িবহরও কমিয়ে এনেছেন প্রধানমন্ত্রী।

মন্ত্রীদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তৃণমূলে চাপের মুখে পড়ছেন সংসদ সদস্যরাও। গত ১২ মার্চ থেকে শুরু হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন। অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এমপিদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি নিজেই সবার আগে সংসদে গিয়েছেন। বাধ্য হয়ে এমপিদের যথাসময়ে সংসদে হাজির হতে হয়েছে। কয়েক দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সংসদ চলেছে। সারাদিন সংসদে থাকায় এমপিরা নিজ এলাকার মানুষের সময় দিতে হিমশিম খেয়েছেন। দেখা গেছে, খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে এলাকা থেকে আগত নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে। তাদের সমস্যার কথা শুনতে হয়েছে। সংসদ শেষ করে রাতে বাসায় ফিরে আবার নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা শুনতে হয়েছে। তাদের দিক নির্দেশনা দিতে হয়েছে।

সাম্প্রতিক এক উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ৮ মার্চ সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে গুলশানের বাসভবন থেকে বের হওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মুচকি হেসে বলেন, ‘চলেন যুদ্ধে যাই।’ এই ছোট উক্তিতেই ফুটে উঠেছে রাষ্ট্র সংস্কার ও জনগণের ভাগ্য বদলে তার প্রতিদিনের সংগ্রামের দৃঢ়প্রত্যয়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোরতা ও পরিশ্রম ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে। ‘ঢিলেঢালা’ কাজের দিন শেষ করে রাষ্ট্রীয় কাজে গতির সঞ্চারে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর গতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সচিবালয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে। সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারাও প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল মনিটরিংয়ের কারণে সতর্ক থাকছেন। ভিডিও কনফারেন্সিং ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ কমে এসেছে। সচিবরা যথাসময়ে অফিসে এসেছেন কি না তা নিজেই স্বচক্ষে দেখতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ঘুরেছেন। এরই মধ্যে গত ২ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে রাত ১১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত টানা ১৬ ঘণ্টা প্রধানমন্ত্রী যেভাবে সচিবালয়, সংসদ অধিবেশন এবং মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠক পরিচালনা করেছেন, তা পুরো প্রশাসনকে সজাগ রেখেছে। রাত ১২টার দিকে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত জানাতে জাতীয় সংসদের ব্রিফিং রুমে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিসহ অন্যদের বেশ ক্লান্ত দেখা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আমলা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর গতির সঙ্গে তাল মেলাতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী। যখন যাকে প্রয়োজন তাকে ডাকছেন। বিভিন্ন তথ্য নিচ্ছেন । এতে প্রশাসনে গতি এসেছে। আমরা যে কর্মযজ্ঞ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি তার সুফল শুধু বিএনপি সরকার নয়, দেশবাসী পাবে।’