হিমঘরই ওদের শেষ সমাধি!

একজন মারা গেছেন অসুস্থ হয়ে, আরেকজনের হয়েছে অপমৃত্যু। জাগতিক দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পরও স্বজনরা তাদের শেষ বিদায় জানাননি কিংবা জানাতে পারেননি। আইনি জটিলতায় আটকে গেছে অন্তিম শয়ান, তাই তাদের ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের লাশ কাটা ঘরে। যেন ‘মরেও শান্তি নেই’ তাদের।

ধর্মপরিচয় আর দুই স্ত্রীর দ্বন্দ্বে এক যুগ ধরে হিমঘরে পড়ে আছে খোকন নন্দী ওরফে রাজীব চৌধুরীর মরদেহ। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালেও কোনো সুরাহা হয়নি। অন্যদিকে ১০ বছর ধরে পড়ে আছে থিইসিয়া সিকেওয়েস্ট নামে দক্ষিণ আফ্রিকার এক তরুণীর মরদেহ। পরিবারের কেউ না আসায় তার মরদেহও হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। ফলে শেষ সমাধি হিসেবে তাদের স্থান হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে।

এক লাশের দাবিদার দুই স্ত্রী : হিন্দু ধর্ম অনুসারে নিহতের নাম হলো খোকন নন্দী। আর ধর্মান্তরিত হওয়ার পরে নাম ধারণ করেন খোকা নন্দী ওরফে রাজিব চৌধুরী। কাগজপত্র অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন খোকন নন্দী, এরপর ১৯৮৪ সালে বিয়ে করেন কলেজশিক্ষিকা হাবিবা আক্তারকে। এই ঘরে কোনো সন্তান নেই। তবে প্রথম স্ত্রী মিরা নন্দীর ঘরে সন্তান রয়েছে।

২০১৪ সালের ১৫ জুন দ্বিতীয় স্ত্রী হাবিবা আক্তারের বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়েন খোকন (৬৮)। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৬ জুন বারডেম হাসপাতালে মারা যান। ছাড়পত্র নিয়ে স্বামীর মরদেহ দাফনের উদ্যোগ নেন হাবিবা আক্তার। এতে বাধা দেন প্রথম স্ত্রী মিরা নন্দী। তিনি মরদেহ নিয়ে সনাতন রীতি অনুসারে সৎকার করতে চান। মরদেহ নিয়ে শুরু হয়ে দুই স্ত্রীর টানাটানি। বিষয়টি থানা পুলিশ হয়ে গড়ায় আদালত পর্যন্ত। সেই থেকে আদালতের রায়ের অপেক্ষায় দুই স্ত্রী। আর মরদেহ পড়ে আছে ঢামেক হিমঘরে।

গত বছরের প্রথম দিকে মামলাটি হাইকোর্টে প্রেরণ করা হয়। আদালত সাক্ষী-প্রমাণসহ দুই পক্ষকে ডাকে এবং পুরো বিষয়টি শুনে। এরই মধ্যে সরকারি ছুটিতে বন্ধ হয় আদালত। ছুটি শেষে বিষয়টি নিয়ে আবারও তৎপর হন দুই পক্ষ। কিন্তু এবার ওই আদালতের বিচারক অন্য বেঞ্চে বদলি হয়ে যান। ফলে বর্তমান আদালতে পুরনো ঘটনা আবারও নতুন করে তুলে রায়ের অপেক্ষায় দুই স্ত্রী। তবে কবে নাগাদ এই রায় ঘোষণা হতে পারে তা অজানা।

জানতে চাইলে খোকন নন্দী ওরফে রাজিব চৌধুরীর প্রথম স্ত্রী মিরা নন্দী বলেন, আমার স্বামীর মরদেহ হিন্দু ধর্ম অনুসারে সৎকার করতে চাই। আমার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলা হলেও সে ঘরে কোনো সন্তান নেই। আমার দুইটা সন্তান রয়েছে। দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও আদালত এখনো রায় দেয়নি। আমি রায়ের অপেক্ষায় রয়েছি।

দ্বিতীয় স্ত্রী হাবিবা আক্তার বলেন, আমার স্বামীর মরদেহ হিমঘরে শুকিয়ে যাচ্ছে। আমি এর সুরাহা চাই। মরদেহটি তো আর সম্পত্তি নয়। এ বিষয়ে আমি মানসিক অশান্তিতে আছি। মৃত্যুর আগে ওর মরদেহটি দাফন করতে চাই। আদালত এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না যে, লাশ কে পাবে? তিনি জানান, ১৯৮০ সালে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এফিডেভিট করে খোকন নন্দী ধর্মান্তরিত হন। এরপর ১৯৮৪ সালের ১৫ জুলাই তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের কাবিননামা ও এফিডেভিটসহ সব নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। জীবিত অবস্থায় খোকন তার ছেলে বাবলু নন্দীকে কোনো দিন সন্তান বলে স্বীকার করেননি। তবে ওই ঘরের চন্দনাকে নিজের মেয়ে বলে স্বীকার করতেন। মুসলিম হওয়ায় এবং আমার ঘরে কোনো সন্তান না থাকায় এখন তারা আমাকে অস্বীকার করছেন। অথচ খোকন জীবিত থাকা অবস্থায় তার ছোট ভাই সুখলাল নন্দী আমার শাহজাহানপুর বাসায় থেকে পড়ালেখা করেছেন। তার মা এসে আমার বাসায় থেকেছেন, রান্না করে খেয়েছেন। এখন খোকনের সব সম্পত্তি তার ভাইরা ও প্রথম স্ত্রী ভাগ-বাটোয়ারা করে খাচ্ছেন।

মূল বিরোধ সম্পত্তি ঘিরে : দুই ধর্মের দুই স্ত্রী খোকনের মরদেহ দাফন কিংবা সৎকার করতে চাইলেও এর মূলে রয়েছে সম্পত্তি। জানা যায়, রাজধানীর ফার্মগেট ‘ক্যাপিটাল মার্কেট’টি খোকন নন্দীর। বিশাল এই মার্কেট থেকে মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় আসে। এ ছাড়াও বেশ কিছু সম্পত্তি রয়েছে। মার্কেটের আয় ও সব সম্পত্তি বর্তমানে তার ভাইয়েরা এবং প্রথম স্ত্রী মিরা নন্দী ভোগদখল করছেন। খোকনের মরদেহ মুসলিম ধর্ম অনুসারে দাফন করা হলে এই সম্পত্তির মালিক কিংবা ভাগ পাবেন মুসলিম স্ত্রী। আর হিন্দু ধর্ম অনুসারে সৎকার হলে সম্পত্তির মালিক কিংবা ভাগ পাবেন হিন্দু স্ত্রী। মূলত এই সম্পত্তি পাওয়ার আশায় কোনো স্ত্রীই খোকনের মরদেহ ছাড়তে নারাজ।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, এ ঘটনা তো ছয় মাস কিংবা এক বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার কথা। সেখানে এক যুগ ধরে ঝুলে আছে এবং লাশও পড়ে আছে। তিনি বলেন, বিচারক অন্য বেঞ্চে চলে গেলেও আবেদন করে মামলাটি সেই বেঞ্চে নেওয়া যেতে পারে। যেহেতু ওই বিচারক পুরো বিষয়টা সম্পর্কে অবগত আছেন। আবার প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করে মামলাটি ওই আদালতে নেওয়া যায়। এসব করার দায়-দায়িত্ব দুই পক্ষের আইনজীবীর। হয়তো এ রায় ঘুরতে থাকলে কোনো না কোনো পক্ষ লাভবান হবেন, তাই কোনো এক পক্ষ চাচ্ছেন না এটি শেষ হোক। তার মতে, খোকন নন্দী ধর্মান্তরিত হলে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করলে তো প্রথম বিয়ে টেকার কথা নয়। বিষয়টি মীমাংসার জন্য দুই পক্ষের আইনজীবীদের জোরালো ভূমিকা রাখা উচিত।

পড়ে আছে দক্ষিণ আফ্রিকার তরুণীর মরদেহ : এক সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা করতেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার দেবীপুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান রিপন। তখন থিইসিয়া সিকেওয়েস্ট নামে ওই দেশের এক তরুণীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাকে বিয়ে করেন রিপন। ২০১৫ সালের শেষের দিকে বিদেশি স্ত্রীকে নিয়ে দেশে ফিরেন তিনি। দেশে আসার পর থিইসিয়া জানতে পারেন, দেশে রিপনের আরেকজন স্ত্রী রয়েছে। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব, মানসিক হতাশা থেকে ২০১৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিষপানে আত্মহত্যা করেন থিইসিয়া। কুমিল্লা সদর হাসপাতালে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছিল, তাতে থিইসিয়ার শরীরে কীটনাশকের উপস্থিতি পেয়েছিলেন চিকিৎসকরা। এ ঘটনায় রিপনকে আসামি করে একটি মামলা করা হয় তখন। সে মামলায় পুলিশ রিপনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালের জুলাই মাসে হাসানুজ্জামান মারা যান। এ ছাড়া বাংলাদেশে দক্ষিণ আফ্রিকার দূতাবাস নেই। থিইসিয়ার নিজের দেশ থেকেও কোনো সন্ধানপ্রত্যাশী আসেনি তার খোঁজে। ফলে কুমিল্লা হয়ে বর্তমানে ঢামেক মর্গে পড়ে আছে থিইসিয়ার মরদেহ।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আরিফ হোসাইন বলেন, বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন। আমাদের পক্ষে এখন আর কিছু করা সম্ভব নয়। কীভাবে লাশের সুরাহা হবে, তাও আমরা জানি না।

ঢামেক মর্গসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের কর্মজীবনে এত দীর্ঘ সময় কোনো মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেননি। যদিও দুই মরদেহ নিয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে। আদালতের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত মরদেহ মর্গেই থাকবে।