খেলাপি ঋণই ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট

দেশের ব্যাংকিং খাত এখন উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও আস্থাসংকটের মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে না পারার ঘটনায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা, খেলাপি ঋণের চাপ, ব্যাংক একীভূতকরণ, সুশাসন ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক নাজমুল ইসলাম।

প্রশ্ন : দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ : গত দশকে দেশের ব্যাংকিং খাত অনেক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও এখনো বড় দুটি চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। একটি হলো খেলাপি ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল), অন্যটি মূলধন ঘাটতি। বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে অনেক ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদ- অনুয়ায়ী প্রয়োজনীয় মূলধন ধরে রাখতে পারছে না। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বেশি চাপে আছে। কিছু বেসরকারি ব্যাংকও একই সমস্যায় ভুগছে।

প্রশ্ন : খেলাপি ঋণ কমাতে অগ্রণী ব্যাংক কী ধরনের কৌশল নিয়েছে?

সৈয়দ আবু নাসের : বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মনীতি মেনে দায়িত্ব পালন করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মেনে কাজ করলে খেলাপি ঋণ কমবে কমবেই। আগে লোন রিশিডিউল করতে ১০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট ছিল। অন্তর্বর্তীসময় সরকার তা ২ শতাংশে নামিয়ে আনে। বর্তমান সরকার তা এখন ১ শতাংশ করে দিয়েছে। এর থেকে সহজ তো নেই। এখন ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে তাহলেই ব্যাংকগুলো তরান্বিত হবে।  এই কৌশলটি বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই করে দিয়েছে।

প্রশ্ন : উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতে কী ধরনের চাপ তৈরি করছে?

সৈয়দ আবু নাসের : খেলাপি ঋণই এখন ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ছে। ভালো উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ পাচ্ছেন না। ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগে অর্থায়ন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাংকের মুনাফা কমে যাচ্ছে। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের সুদ বা মুনাফা সময়মতো দিতে পারছে না। ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। খেলাপি ঋণ বাড়লে নতুন প্রকল্পে অর্থায়ন কমে যায়। এতে কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ব্যালান্সশিট দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পুরো আর্থিক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

প্রশ্ন : অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবসায়িক অগ্রাধিকার খাতগুলো কী কী?

সৈয়দ আবু নাসের : অগ্রণী ব্যাংকের যে পলিসি গ্রহণ করা হয়েছে, তা হলো আমরা মাইক্রো ও এসএমই খাতকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে আসছি। সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা আছে কৃষি খাতকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই মুহূর্তে আমরা করপোরেট ক্লাইন্ট নিচ্ছি না। পুরনো যারা রয়েছে তাদের বেশি বেশি তদারকির উপর রেখেছি।  তাদের কোম্পনিগুলোকে চালু রাখতে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিচ্ছি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরে আমাদের প্রায় ৫০ শতাংশ খেলাপী হয়েছে, যা আমাদের সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে কমপক্ষে তিন থেকে ৫ বছর সময় লাগবে। 

প্রশ্ন : আমানত ও ঋণ প্রবৃদ্ধিতে অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা কী?

সৈয়দ আবু নাসের : আমি বলব এটি যেহেতু সরকারি ব্যাংক। সারা বাংলাদেশে আমাদের ৯৭৯টি ব্রাঞ্চ রয়েছে। আমাদের ডিপোজিট সংগ্রহ করা খুবই সহজ। এই মুহূর্তে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি আমানত রয়েছে। সব মিলিয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধির হার আমাদের ভালো রয়েছে।

প্রশ্ন : ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমাতে কী ধরনের সংস্কার চলছে?

সৈয়দ আবু নাসের : সার্বিকভাবে খরচ কমানোটা খুবই কঠিন বিষয়। মুখে বলা যায় কিন্তু করা যায় না। তবে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে খরচ কমানোর বিষয়ে সতর্ক আছি। সাশ্রয় করতে আমরা চেষ্টা করছি। কর্মকর্তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে আমরা বোনাসও দিচ্ছি না। যেহেতু লসে আছি।

প্রশ্ন : গ্রাহক সেবা উন্নয়নে নতুন কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

সৈয়দ আবু নাসের : আমি ১৯৭৩ সনে চাকরি জীবন শুরু করি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। এর পরে মধ্যেপ্রাচ্যে ইউএস এর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কাজ করি। দেশের বাইরে আমার কাজের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি দেশের সেবা দেওয়ার জন্য আসি। এই সেবা প্রদানে নিজের ইচ্ছে থাকতে হবে তা না হলে হবে না। গ্রাহককে সালাম দিতে হবে, সম্মান করতে হবে। এ ছাড়া গ্রাহকের সেবা দোরগড়ায় পৌঁছাতে বিভিন্ন বিষয়ে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু অব্যাহত রয়েছে।

প্রশ্ন : ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা কীভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?

সৈয়দ আবু নাসের : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমানতকারীদের টাকা সময়মতো ফেরত দেওয়া। মানুষ যদি তার জমা রাখা অর্থ ও মুনাফা সময়মতো না পায়, তাহলে ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা থাকবে না। বর্তমানে কয়েকটি ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকেই চাকরিজীবনের সঞ্চয় বা সম্পদ বিক্রি করে এসব প্রতিষ্ঠানে অর্থ রেখেছিলেন। এখন তারা বিপদে পড়েছেন। মানুষ ভেবেছিল, এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও নিয়ন্ত্রিত, তাই তাদের অর্থ নিরাপদ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে অনেকে অর্থ তুলতে না পেরে চরম সংকটে পড়েছেন। আমি মনে করি, আমানতকারীরাই ব্যাংকের প্রকৃত মালিক। পরিচালকদের দায়িত্ব হলো সেই অর্থ নিরাপদ ও লাভজনকভাবে পরিচালনা করা।

প্রশ্ন : সাম্প্রতিক ব্যাংক একীভূতকরণ উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দ আবু নাসের : ব্যাংক একীভূতকরণ বা মার্জার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রক্রিয়া। এটি খারাপ কিছু নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে একীভূতকরণের সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে আমানতকারীদের স্বার্থকে। কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের অর্থ ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না। প্রয়োজনে তারল্য সহায়তা দিতে হবে। যেসব ব্যাংকে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে, সেখানে সাবেক পরিচালকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে তাদের শেয়ার বিক্রি করে নতুন বিনিয়োগকারীদের আনার বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রশ্ন : দুর্বল ব্যাংকগুলোতে সরকারি অর্থে মূলধন সহায়তা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন?

সৈয়দ আবু নাসের : সরকারের অর্থ দিয়ে বেসরকারি ব্যাংককে টিকিয়ে রাখার পক্ষে আমি নই। মূলধন আসা উচিত শেয়ারহোল্ডার, স্টেকহোল্ডার ও পুঁজিবাজার থেকে। এ জন্য দেশের ক্যাপিটাল মার্কেট ও বন্ড মার্কেটকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

প্রশ্ন : ব্যাংকিং খাতে নতুন নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি কতটা কার্যকর হবে বলে মনে করেন?

সৈয়দ আবু নাসের : আমি আশাবাদী। গত দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতে মনিটরিং ও সুপারভিশন বেড়েছে। নতুন গভর্নর ও নতুন সরকারের সময় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ভালো কিছু সার্কুলার জারি হচ্ছে। সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে নিয়মিত তদারকি, জবাবদিহি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে। তাহলেই ধীরে ধীরে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

প্রশ্ন : রাজনৈতিক বা প্রভাবশালীদের চাপ ব্যাংকিং খাতে কতটা প্রভাব ফেলে? 

সৈয়দ আবু নাসের : ঋণ গ্রহীতাদের রাজনৈতিক প্রভাব সবসমই আছে। রাজনৈতিক খেলাপি ঋণ স্বাধীনতার পর থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ঘাড়ে চেপে আছে। এটি আমাদের ঐতিহ্যগতভাবে পাওয়া। এ দায় আমাদের সময়ের নয়, দায় গত নির্বাচিত সরকারের। এই চাপ আছে থাকবেই। আমি ২০০৪ সনে এই ব্যাংকের এমডি ছিলাম। এরপর ২০১০ সনে বিদায় নিয়েছি। ২০০৪ সালে যখন ব্যাংকটি আমি টেকওভার করি, তখন সব ইন্ডিকেটর নেগেটিভ ছিল। ক্যাপিটাল ছিল নেগেটিভ, খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪০ শতাংশের ওপরে, ক্যামেলস রেটিং ছিল খারাপ। ২০০৪ সালে ইক্যুইটি ছিল নেগেটিভ ২২০০ কোটি টাকা, আমি সেটা ২০১০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ পজিটিভে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। খুবই অবিশ্বাস্য লেগেছে। ক্যাপিটাল যেটা আমি রেখে গিয়েছিলাম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, সেটা এসে দাঁড়ায় মাত্র ০ দশমিক ৫ শতাংশে। খেলাপি ঋণ ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। বিগত সরকারের ১৫ বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা লেফট অ্যান্ড রাইট হ্যান্ড হয়েছে। এরা নিশ্চয় প্রভাবশালী গ্রাহক বা রাজনৈতিক ব্যক্তি। তবে আজকের ব্যাংকিং খাতের যে অস্থিরতা, তা এখন আস্তে আস্তে কমে আসছে।  এখন আমাদের এগিয়ে নিতে হবে। কিন্তু তা দুই এক বছরে সম্ভব নয়।

দেশ রূপান্তরকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ : আপনাকে, দেশ রূপান্তর পরিবার ও পাঠকদের ধন্যবাদ ও কৃজ্ঞতা।