ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরির অবস্থানে যায়নি অর্থনীতি

বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে দেশেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, দুর্বল বিনিয়োগ পরিস্থিতি, জ্বালানির অনিশ্চিয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতি চাপে রয়েছে। দৃশ্যমান অবস্থায় অর্থনৈতিক সূচকগুলোয় সামান্য উন্নতির দেখা মিললেও তা উল্লেখযোগ্য শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। যার মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি বা বৃহৎ শিল্প সম্প্রসারণ ঘটাতে পারে। তবে কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা একটি শক্ত অবস্থানে থাকলেও এই চাপ সামাল দিতে পারছে না উৎপাদনমুখী শিল্প এবং সেবা খাত।

গতকাল শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই) : ঢাকার সামষ্টিক অর্থনীতির ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীদের এ সংগঠনটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের জুলাই-সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকের অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০২৫ পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করে এই সূচক মূল্যায়ন করেছে। এই গবেষণা কার্যক্রমে মোট ৭৬২ জনের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যেখানে উৎপাদন ও সেবা খাতের প্রতিনিধি ছিলেন যথাক্রমে ৩৩০ এবং ৪৩২ জন। সেমিনারে সূচকের বিস্তারিত উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারে মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী।

ঢাকা চেম্বার বলছে, এই সংকটের মধ্যেও কৃষি খাত ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে এর মধ্যে প্রাণিসম্পদ খাতে জলবায়ুর প্রভাবে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমেছে। এ খাতের সামগ্রিক অবস্থাকে ঢাকা চেম্বার বলছে, এটি এখন উৎপাদননির্ভর না হয়ে বরং ভোগনির্ভর অবস্থায় রয়েছে। তবে উৎপাদনমুখী শিল্পে সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও তা অত্যন্ত দুর্বল শিল্প কার্যক্রমকেই তুলে ধরেছে। উপরিভাগে স্থিতিশীল মনে হলেও ভেতরে গভীর ভারসাম্যহীনতার কথা উঠে এসেছে। এদিকে সেবা খাতের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য উন্নতির লক্ষণ রয়েছে। যদিও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো এখনো পর্যাপ্ত সেবা ও অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত।

ডিসিসিআই মহাসচিব আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী বলেন, বিদ্যমান অবস্থার উত্তরণে কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাজারমূল্য স্থিতিশীল করা ও সাপ্লাইচেইন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন দরকার। এসএমই উদ্যোক্তাদের স্বল্পসুদে ও সহজশর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান, শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি নিশ্চিতকরণ, অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া বাণিজ্য এবং বিনিয়োগবিষয়ক সরকারি লাইসেন্সিং সেবা প্রাপ্তিতে সময় ও হয়রানি হ্রাস, বিদ্যমান ভ্যাট হার কমিয়ে আনা, বন্দরগুলোতে পণ্য পরীক্ষা ও খালাস প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, প্রচলিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক ও পরিমাপক ব্যবস্থা, স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা ও তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের প্রতিফলন ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ প্রণয়নে ব্যর্থতা দেখা গেছে। এক্ষেত্রে ঢাকা চেম্বারের ইপিআই নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও গবেষকদের বাস্তব অবস্থার নিরিখে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সহায়তা করবে।

অর্থনীতিবিদ ও পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমটি ঢাকাকেন্দ্রিক হয়েছে, তবে দেশব্যাপী করতে পারলে আরও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। এ ধরনের সূচকের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা দেশে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ যাচাইয়ের পাশাপাশি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে সুবিধা হবে।

সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল প্রজেক্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ নেসার আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় ইউরোপের বাজারে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে থাকে। এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে এ সুবিধা থাকবে না। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে এসএমইরা। এ অবস্থা উত্তরণে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং ব্যবসাসহায়ক নীতি সহায়তা নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।