মার্কিন বাণিজ্য বনাম চিনা ডকট্রিন

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি কেবল দুটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমগ্র বৈশি^ক ব্যবস্থার স্নায়ুকেন্দ্র। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ দুই পরাশক্তির সাম্প্রতিক শীর্ষ বৈঠকটি, সমসাময়িক আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। এই সামিটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, কৌশলগত চাল এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পরিলক্ষিত হয়েছে, তা কেবল সাধারণ কূটনৈতিক আলোচনা ছিল না; এটি ছিল একবিংশ শতাব্দীর বৈশি^ক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্র্নিধারণের এক জটিল মহড়া। যেখানে এক পক্ষ ব্যক্তিগত সম্পর্ক, তাৎক্ষণিক ব্যবসায়িক লাভ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈতরণী পার হওয়ার সমীকরণ নিয়ে হাজির হয়েছিল। অন্যপক্ষ সেখানে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ডকট্রিন, সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদ প্রস্তুত করে অপেক্ষা করছিল। এই দুই বিপরীতধর্মী কূটনৈতিক দর্শনের মুখোমুখি অবস্থান, সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিকে এক সম্পূর্ণ নতুন সমীকরণের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সূক্ষ্ম ভারসাম্য এই সামিটের উদ্বোধনী মুহূর্তেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। মার্কিন নেতৃত্ব যখন উষ্ণতা প্রদর্শন করে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ওপর জোর দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই চীনের নেতৃত্ব সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর ভাষায় বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রকৃত শর্তগুলো নির্ধারণ করে দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বন্ধুত্বের বার্তার জবাবে চীনের পক্ষ থেকে সরাসরি তাইওয়ান ইস্যুটিকে সামনে আনা হয় এবং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানানো হয়, এই একটিমাত্র বিষয়ের ওপরই দুই দেশের সমগ্র সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে। এই অবস্থানটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে বহুল আলোচিত ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ ধারণাকে পুনরুজ্জীবিত করে।

এই সামিটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল, দুই দেশের প্রতিনিধি দলের গঠন প্রণালি। ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ে তাদের সবচেয়ে বড় ডিলমেকার এবং প্রযুক্তি জগতের মহারথীদের নিয়ে হাজির হয়েছিল। এই প্রতিনিধি দলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা যুদ্ধমন্ত্রীর পাশাপাশি ইলন মাস্ক, টিম কুক এবং জেনসেন হুয়াং-এর মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অন্যদিকে বেইজিং তাদের পক্ষে রেখেছিল সম্পূর্ণ নীতিনির্ধারক ও সরকারি কর্মকর্তাদের। এই বিন্যাসটি স্পষ্ট করে দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এসেছিল ব্যবসা করতে এবং তাৎক্ষণিক কিছু চুক্তি সই করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেদের সাফল্য জাহির করতে। কিন্তু চীন এই উপস্থিতিকে ব্যবহার করেছে একটি বহুমাত্রিক কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে। অ্যাপলের উৎপাদন লাইন, টেসলার গিগাফ্যাক্টরি কিংবা এনভিডিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত চিপের বাজার সব কিছুই চীনের ভূখণ্ডের ওপর এবং তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল। চীনের নেতৃত্ব যখন তাইওয়ান প্রশ্নে সংঘাতের সতর্কবার্তা উচ্চারণ করছিলেন, তখন সেই বার্তা কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্টের কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি, বরং তার পেছনে বসে থাকা মার্কিন করপোরেট অভিজাত শ্রেণির হৃদকম্পন বাড়িয়ে দিয়েছিল। চীন অত্যন্ত নিখুঁত অস্ত্রোপচারের মতো করে, মার্কিন বাণিজ্য খাতের এই নির্ভরতাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করেছে যা প্রকারান্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার এক পরোক্ষ হাতিয়ার। সামিটের ঠিক আগে, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেইজিং সফর এবং মার্কিন অবস্থান নিয়ে চীনের সঙ্গে শলাপরামর্শ প্রমাণ করে যে, চীন নিজেকে এই সংকটের একমাত্র মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এই কৌশলগত ফাঁদটি রাতারাতি তৈরি হয়নি, বরং এর পেছনে রয়েছে বিগত কয়েক মাসের আন্তর্জাতিক সংকটের নিখুঁত ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে সংঘাত এবং যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা এই সামিটের সমীকরণে একটি বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পাশাপাশি আরেকটি অদৃশ্য প্রাচীর এই সামিটে মার্কিন পক্ষকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল, তা হলো বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট এবং খনিজ পদার্থের ওপর চীনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। বিগত বছরগুলোতে মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং শুল্ক যুদ্ধের জবাবে চীন যখন তাদের এই চূড়ান্ত অর্থনৈতিক অস্ত্রটি ব্যবহার করার হুমকি দিয়েছিল, তখনই মার্কিন প্রযুক্তি খাত এবং সামরিক শিল্প উৎপাদন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়। আধুনিক যুগের অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধবিমান এবং সিলিকন ভ্যালির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপস সব কিছুর জন্যই বিরল খনিজ উপাদান অপরিহার্য। সামিটের টেবিলে মার্কিন প্রতিনিধি দলে উপস্থিত প্রযুক্তি খাতের প্রধানদের নিজস্ব ব্যবসায়িক অস্তিত্ব, খনিজ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চীন যখন কৌশলগত স্থিতিশীলতার কথা বলে, তখন তা কোনো অংশীদারত্বের ভাষা থাকে না, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় এক ধরনের ব্যবস্থাপকের শর্তাবলি। যুক্তরাষ্ট্র এই সামিটে মূলত সেই সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক প্রকার ক্রেতা হিসেবে হাজির হয়েছিল, যেখানে চীন ছিল একমাত্র বিক্রেতা। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণটি এই সামিটের পর এক সম্পূর্ণ নতুন এবং ধোঁয়াশাপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিগত বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাইওয়ানের জন্য এক বিশাল অঙ্কের সামরিক সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করা হলেও, দীর্ঘ সাত মাস ধরে তা প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের মারপ্যাঁচে আটকে রয়েছে এবং এর কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী বিলম্ব এবং মার্কিন নেতৃত্বের দ্বিধাদ্বন্দ্ব তাইওয়ানের নিজস্ব নীতিনির্ধারকদের মনে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। সামিট চলাকালীন তাইওয়ানের সরকারের পক্ষ থেকে যে অত্যন্ত সতর্ক বিবৃতি এসেছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তারা আর পুরোপুরি মার্কিন নিরাপত্তার গ্যারান্টির ওপর অন্ধভাবে ভরসা করতে পারছে না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, এই সামিট পরবর্তী পৃথিবী ডলারের একচেটিয়া সাম্রাজ্যের অবসানকে আরও ত্বরান্বিত করবে। চীন যেভাবে তার নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম এবং ব্লকিং স্ট্যাচুটের মাধ্যমে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলোকে অকার্যকর করে দিয়েছে, তা বিশ্বের অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করবে। রাশিয়া, ইরান এবং চীনের মধ্যকার যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অক্ষ তৈরি হয়েছে, তা এই সামিটের পর আরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে।

বিশ্ব বাণিজ্য এখন থেকে কেবল মুক্ত বাজারের নিয়মে চলবে না, বরং তা রাজনৈতিকভাবে নির্ভরযোগ্য মিত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ অর্থনৈতিক বলয়ে রূপ নেবে। এর ফলে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলো এক চরম সংকটের মুখে পড়বে। কারণ তাদের যেকোনো একটি ব্লকের পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য করা হবে, যা তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পরিপন্থি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসবে ভারসাম্য রক্ষার নীতিতে। বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ এই দর্শনে ভর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে আসছিল। বেইজিং যখন এ অঞ্চলে নিজের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে, তখন ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর বেইজিং-ঘেঁষা নীতি কমানোর জন্য, এক ধরনের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ চাপ আসতে পারে। বিশেষ করে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বা মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোকে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইতে পারে, যাতে তারা চীনা বলয়ে পুরোপুরি ঢুকে না পড়ে। অর্থনৈতিক প্রভাবটি হবে সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং জটিল। বাংলাদেশ বর্তমানে তার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভস (BRI) এবং বাণিজ্যিক বাজারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের ওপর প্রযুক্তির নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখে, তবে বাংলাদেশ বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো, যারা চীনা কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক বা ইলেকট্রনিক্স পণ্য মার্কিন বাজারে রপ্তানি করে, তারা এক ধরনের শুল্ক বা নীতিগত জটিলতায় পড়তে পারে। সামরিক ক্ষেত্রে এই সামিটের প্রভাব এশিয়ার সমুদ্রসীমাকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে।

চীনের সামরিক আধুনিকায়ন এবং দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের আধিপত্য বিস্তারের নীতি এই সামিটের পর আরও বেশি গতি পাবে, কারণ ওয়াশিংটন আপাতত নিজের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ব্যস্ত। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে যারা ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো চীনের সঙ্গে জলসীমা বিরোধে লিপ্ত, তারা এক চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। মার্কিন নিরাপত্তার গ্যারান্টি দুর্বল হয়ে পড়ায় এই অঞ্চলের দেশগুলো নিজেদের সামরিক বাজেট বাড়াতে বাধ্য হবে, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এক নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, চীনা সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ওপর আমাদের যে দীর্ঘদিনের নির্ভরতা রয়েছে, তা আরও গভীর হতে পারে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে এই অঞ্চলটি এক চরম মেরুকরণের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো তখন ভারত এবং চীনের এক তীব্র প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের ভেতরের ফাটল আরও স্পষ্ট হবে; কম্বোডিয়া বা লাওসের মতো চীনা-ঘেঁষা দেশগুলোর সঙ্গে ফিলিপাইন বা সিঙ্গাপুরের মতো মার্কিন-ঘেঁষা দেশগুলোর দূরত্ব বাড়বে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য সামনের দিনগুলো হবে এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক পথচলা, যেখানে সামান্যতম ভুল চাল যেকোনো রাষ্ট্রকে পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের বলি বানিয়ে দিতে পারে। এই অবস্থায় নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক  ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।