অর্থনীতির চেহারা  

কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি জরুরি

দেশের অর্থনীতির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। পরপর রাশিয়া-ইউক্রেন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধসহ নানামুখী বৈশ্বিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ¦ালানির অনিশ্চয়তা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এতে সমাজে সীমিত আয়ের মানুষ অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশ চাপে আছে। এর সঙ্গে দুর্বল বিনিয়োগ পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপসহ নানা কারণে নতুন কর্মসংস্থান কম হচ্ছে। এই মূল্যায়ন ঢাকা চেম্বার অ্যান্ড কমার্স ইন্ডাস্ট্রির। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি। গত কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ ধীরগতিতে চলতে থাকায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। শিক্ষিত নাগরিকদের মধ্যে বেকারত্ব ও ছদ্মবেকারত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, স্নাতক তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমন্বয়ের ঘাটতিও এর অন্যতম কারণ। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকার কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথা বলছে। 

কাজের যে বিপুল চাহিদা, তা মেটাতে কেবল সরকারি চাকরিতে নিয়োগ কখনোই যথেষ্ট নয়। এ কারণে কর্মসংস্থানের নানামুখী ও ব্যাপক যে উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তা মূলত হতে হবে বেসরকারি খাতে, তৃণমূলে গ্রাম ও ছোট শহর থেকে শুরু করে নগর-বন্দর, সর্বত্র। এক্ষেত্রে জরুরিভিত্তিতে দরকার সমন্বিত কর্মসৃজন পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ। ব্যক্তিগতভাবে ও কয়েকজন মিলে নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়া গেলে এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা গেলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বিভিন্ন খাতে কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিভিন্ন ধরনের শিল্প ও ব্যবসার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করা দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে ন্যায্যমূল্যে শিল্পের কাঁচামালের সরবরাহ ও জনশক্তির সহজপ্রাপ্যতার দিকগুলো বিবেচনায় রেখে প্রতিটি গ্রামকে কুটিরশিল্প গড়ার পরিকল্পনার আওতায় আনা যেতে পারে। এতে তৃণমূলের অর্থনীতি জোরদার হবে। এক্ষেত্রে তরুণ, শিক্ষিত ও উদ্ভাবনী ধারণা আছে, এমন উদ্যোক্তাদের সহজ ও সুদমুক্ত অর্থায়নও করা দরকার। এক্ষেত্রে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় করা যেতে পারে। গ্রামনির্ভর অর্থনৈতিক উদ্যোগ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বেশি উপকারে আসবে বলে আমরা মনে করি। আজকাল অনেক গ্রামে কৃষি শ্রমিক পাওয়া যায় না। চাষবাসে বৈচিত্র্য আনা ও বহুমুখী করা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প উদ্যোগকে উৎসাহিত করে এ সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কৃষকের ক্ষেত থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত পণ্য বিক্রির পর্যায়গুলোতে ফড়িয়াদের যে সিন্ডিকেট, তা কিছুদিন কম সক্রিয় ছিল। এরা আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের তৎপরতা নস্যাৎ করে সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে বাজারমূল্য স্থিতিশীল করাও দরকার। এতে কৃষকের স্বার্থরক্ষা ও উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সহজ হতে পারে।

সরকার তরুণদের জন্য দেশে ও বিদেশে তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত শ্রমবাজারের পাশাপাশি  ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকংসহ বিভিন্ন দেশে কাজের সুযোগ আছে। সরকার আগামী ৫ বছরে বিদেশে ১ কোটি তরুণের কর্মসংস্থান করতে চায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষা, প্রয়োজনীয় বিদেশি ভাষা শেখা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। শিল্প খাতে মাঝারি মাপের উদ্যোগ বাড়ানো গেলে তাও কর্মসংস্থানে ভালোভাবে সহায়ক হতে পারে। আমাদের কোন কোন খাত দুর্বল অবস্থানে আছে, আবার সম্ভাবনাও রয়েছে, গবেষণার মাধ্যমে তা খুঁজে নিতে হবে। নাগরিকদের ও দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে সরকার বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেবে, এমন প্রত্যাশা আমাদের সবার।